সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচলিত ভূরাজনীতির মেরূকরণ বলতে মূলত যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া—এই তিন পরাশক্তিকেই বোঝানো হতো। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ বিশ্ববাসীর সামনে নতুন এক সমীকরণ নিয়ে এসেছে।
অদম্য মনোবল, ভৌগোলিক অবস্থান এবং কৌশলগত মারপ্যাঁচে ইরান এখন বিশ্বের ‘চতুর্থ পরাশক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অহং মাটিতে মিশিয়ে কার্যত যুদ্ধজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইরান।
ইরান সরাসরি লড়ছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে। গত এক মাসে দেশটি তার সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ প্রায় সব সামরিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বকে হারিয়েছে। যেকোনো সাধারণ দেশের জন্য এটি ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি হলেও ইরান অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের পেছনে শক্ত কোনো ‘নিরাপত্তা ঢাল’ নেই। চীন বা রাশিয়ার মতো বড় শক্তিগুলোর কাছ থেকে কোনো সরাসরি সামরিক সহায়তা বা গ্যারান্টি ছাড়াই তারা এগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অহংকার চূর্ণ করে অবশেষে তাদের আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে।
ইরান পরিস্থিতি এখন কেবল একটি সাময়িক সামরিক উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি বিশ্ব ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তনের একটি নতুন মোড়। দেশটিকে পরাশক্তি হিসেবে বিবেচনার প্রধান কারণ ‘হরমুজ প্রণালি।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত কয়েক সপ্তাহে ইরান এই রুটে যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, তা বিশ্ববাজারকে বলতে গেলে কাঁপিয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। হয় তাদের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে, নয়তো ইরানকে একটি বৈশ্বিক শক্তিকেন্দ্র হিসেবে মেনে নিতে হবে। এই যুদ্ধ কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি বিশ্বব্যবস্থার অপরিবর্তনীয়ভাবকে বদলে দেওয়ার এক রূপান্তরমূলক অধ্যায়।
রাজনীতি বা যুদ্ধের শেষ পরিণতি নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তবে সাম্প্রতিক ইতিহাসে খুব কম দেশই এত চাপের মুখে এমন অটুট মনোবল দেখাতে পেরেছে। ফলে, বিশ্বের ‘চতুর্থ পরাশক্তি’এখন ইরান- এ দাবি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে দেশটির ভূমিকা দ্রুত বাড়ছে। পাল্টে যাচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ।
আরো পড়ুন: