ইতিহাসে এমন অনেক শাসক রয়েছেন, যারা একসময় নিজেদের দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু গণআন্দোলন, সামরিক অভ্যুত্থান, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তাদের পতন শুধু একটি সরকারের পরিবর্তন নয়, বরং একটি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এমনকি বিশ্ব রাজনীতির গতিপথও বদলে দিয়েছে। বিশ্ব ইতিহাসে ক্ষমতার উত্থান যেমন নাটকীয়, তেমনি পতনও অনেক সময় আরও বেশি আলোচিত। সাদ্দাম হুসেইন থেকে গাদ্দাফি, মুবারক থেকে আল-বশির—প্রতিটি ঘটনার পেছনে ছিল ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা। এসব ঘটনা আজও গবেষক, ইতিহাসবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ক্ষমতাচ্যুত ১০ নেতার গল্প।
১. সাদ্দাম হুসেইনের পতন: যেভাবে ক্ষমতাচ্যুত হলেন ইরাকের সবচেয়ে আলোচিত শাসক
সাদ্দাম হুসেইন ছিলেন ইরাকের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত নেতা। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি প্রায় ২৪ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তার শাসনামলে ইরাক একদিকে যেমন শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়, অন্যদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং একাধিক যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। সাদ্দাম হুসেইন ১৯৬৮ সালে বাথ পার্টির ক্ষমতা দখলের পর ধীরে ধীরে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। ১৯৭৯ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাকের প্রেসিডেন্ট হন। ক্ষমতায় এসে তিনি—রাষ্ট্রের তেল সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেন। বিরোধী দল ও সমালোচকদের কঠোরভাবে দমন করেন। গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। ১৯৮০ সালে সাদ্দাম ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। আট বছরব্যাপী এই যুদ্ধে উভয় দেশের লাখো মানুষ নিহত ও আহত হয়। যুদ্ধ শেষে ইরাক অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিপুল ঋণের বোঝা তৈরি হয়। সাদ্দামের পতনের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দাবি করে যে ইরাকের কাছে বিধ্বংসী অস্ত্র (Weapons of Mass Destruction বা WMD) রয়েছে এবং সেগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এছাড়া সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগও তোলা হয়। ২০ মার্চ ২০০৩ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে। ৯ এপ্রিল ২০০৩ রাজধানী বাগদাদ কার্যত জোট বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফিরদৌস স্কয়ারে সাদ্দাম হুসেইনের বিশাল মূর্তি ভেঙে ফেলার দৃশ্য বিশ্বজুড়ে প্রচারিত হয়। এই ঘটনাকে অনেকেই তার শাসনের প্রতীকী সমাপ্তি হিসেবে দেখেন। বাগদাদ পতনের পর সাদ্দাম কয়েক মাস আত্মগোপনে ছিলেন। ১৩ ডিসেম্বর ২০০৩ মার্কিন বাহিনী “Operation Red Dawn” অভিযানে ইরাকের তিকরিতের কাছে একটি ভূগর্ভস্থ লুকানোর স্থানে তাকে জীবিত গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর তার দাড়িওয়ালা ও ক্লান্ত চেহারার ছবি বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ৫ নভেম্বর ২০০৬ আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ৩০ ডিসেম্বর ২০০৬ ফাঁসির মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তার মৃত্যুর মাধ্যমে ইরাকের কয়েক দশকের এক অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
২. মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন: যেভাবে শেষ হলো লিবিয়ার ৪২ বছরের শাসন
মুয়াম্মার গাদ্দাফি ছিলেন লিবিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও বিতর্কিত শাসকদের একজন। ১৯৬৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে তিনি টানা ৪২ বছর দেশ শাসন করেন। তেলসমৃদ্ধ লিবিয়াকে তিনি একদিকে আফ্রিকার অন্যতম ধনী দেশে পরিণত করলেও, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত করা, বিরোধীদের দমন এবং একক শাসনের জন্য ব্যাপক সমালোচিত হন। ১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর, মাত্র ২৭ বছর বয়সে সেনাবাহিনীর একদল তরুণ কর্মকর্তাকে নিয়ে গাদ্দাফি রাজা ইদ্রিসকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ক্ষমতায় এসে তিনি— রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করেন। দেশের তেল শিল্প জাতীয়করণ করেন। বিদেশি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করেন। নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন “তৃতীয় আন্তর্জাতিক তত্ত্ব” (Third International Theory) প্রচার করেন। গাদ্দাফি নিজেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি না বললেও দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতা তার হাতেই ছিল। তার শাসনামলে— তেল আয় থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগ করা হয়। বহু নাগরিক বিনামূল্যে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ পান। অবকাঠামো উন্নয়ন হয়, বিশেষ করে Great Man-Made River প্রকল্পের মাধ্যমে মরুভূমিতে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। তবে একই সঙ্গে— বিরোধী দল কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত ছিল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিক ভিন্নমত কঠোরভাবে দমন করা হতো। ২০১০ সালের শেষ দিকে তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্ত দ্রুত মিশর, ইয়েমেন, সিরিয়া ও লিবিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিবিয়ার বেনগাজি শহরে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। বিক্ষোভ দ্রুত সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়। সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষ ক্রমেই তীব্র হতে থাকে। বিদ্রোহীরা দেশের পূর্বাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নেয়। গাদ্দাফি ঘোষণা দেন যে তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করবেন। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর, গাদ্দাফি নিজ শহর সির্তে থেকে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। তার বহরে বিমান হামলার পর তিনি বিদ্রোহীদের হাতে আটক হন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি নিহত হন। তার মৃত্যুর সঠিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন তদন্তে অভিযোগ ওঠে যে তাকে আটক করার পর বিচার ছাড়াই হত্যা করা হয়। মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন শুধু একজন শাসকের ক্ষমতাচ্যুতি ছিল না; এটি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার রাজনীতিতে এক বড় মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আরব বসন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে এই ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। তবে তার পতনের পর লিবিয়ায় যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, তা দেখায় যে একটি সরকারের পতনের পর টেকসই রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা কতটা কঠিন হতে পারে।
৩. হোসনি মুবারকের পতন: যেভাবে শেষ হলো মিশরের ৩০ বছরের শাসন
হোসনি মুবারক ছিলেন মিশরের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি শাসক। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত হত্যার পর তিনি ক্ষমতায় আসেন এবং টানা প্রায় ৩০ বছর দেশ শাসন করেন। তার শাসনামলে মিশর মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও, দুর্নীতি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং জরুরি আইন জারির কারণে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর সামরিক কুচকাওয়াজ চলাকালে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত নিহত হন। তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন হোসনি মুবারক। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি মিশরের প্রেসিডেন্ট হন। ক্ষমতায় এসে তিনি— জরুরি আইন (Emergency Law) বহাল রাখেন। নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করেন। রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর কঠোর নজরদারি চালান। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিতি পান। মুবারকের ৩০ বছরের শাসন আমলে— পর্যটন খাতের উন্নয়ন হয়। সুয়েজ খাল থেকে আয় বৃদ্ধি পায়। বিদেশি বিনিয়োগ আসে। তবে একই সময়ে—দুর্নীতি ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। যুবসমাজের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হয়। বিরোধী দল ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালের শুরুতে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেন আলির পতনের পর মিশরেও পরিবর্তনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। ২৫ জানুয়ারি ২০১১ হাজার হাজার মানুষ কায়রোর তাহরির স্কয়ারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু করে। ২০১১ সালে ১৮ দিনের টানা গণআন্দোলনের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সুলেইমান ঘোষণা দেন যে হোসনি মুবারক প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। এর মাধ্যমে তার ৩০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। হোসনি মুবারক ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে ৯১ বছর বয়সে কায়রোর একটি সামরিক হাসপাতালে মারা যান। হোসনি মুবারকের পতন ছিল আরব বসন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মাত্র ১৮ দিনের গণআন্দোলন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজনকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছিল। এই ঘটনা শুধু মিশরের রাজনীতিই বদলে দেয়নি, বরং পুরো আরব বিশ্বে গণআন্দোলনের নতুন অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছিল। তবে পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো দেখায় যে, দীর্ঘদিনের শাসনের অবসানের পর স্থিতিশীল ও টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
৪. জিন এল আবিদিন বেন আলির পতন: যে ঘটনায় শুরু হয়েছিল আরব বসন্ত
জিন এল আবিদিন বেন আলি ছিলেন তিউনিসিয়ার দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট এবং আরব বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি শাসক। ১৯৮৭ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি টানা ২৩ বছর দেশ শাসন করেন। তার শাসনামলে অর্থনীতির কিছু খাতে অগ্রগতি হলেও দুর্নীতি, বেকারত্ব, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ছিল। ২০১১ সালে তার পতনের মধ্য দিয়েই শুরু হয় আরব বসন্ত (Arab Spring), যা পরে মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া এবং অন্যান্য আরব দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৭ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাবিব বুরগুইবাকে স্বাস্থ্যগত কারণে শাসনে অক্ষম ঘোষণা করা হয়। তখন প্রধানমন্ত্রী জিন এল আবিদিন বেন আলি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ক্ষমতায় এসে তিনি— রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেন। পর্যটন ও রপ্তানি খাতকে শক্তিশালী করেন। বেন আলির শাসনামলে তিউনিসিয়ার অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। তার সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল— ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বিরোধী দল দমন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করা, মানবাধিকার লঙ্ঘন। বেন আলির পতনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল মোহাম্মদ বুয়াজিজি নামের এক তরুণ ফল বিক্রেতার আত্মাহুতির ঘটনা। ১৭ ডিসেম্বর ২০১০, তিউনিসিয়ার সিদি বুজিদ শহরে পুলিশের সঙ্গে বিরোধের পর তার পণ্য জব্দ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। প্রতিবাদ ও হতাশা থেকে তিনি সরকারি কার্যালয়ের সামনে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। তার এই ঘটনা দ্রুত দেশজুড়ে ক্ষোভের প্রতীক হয়ে ওঠে। বুয়াজিজির ঘটনার পর—হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বেকারত্ব, দুর্নীতি ও সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলন দ্রুত রাজধানী তিউনিসসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন।জিন এল আবিদিন বেন আলি ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সৌদি আরবের জেদ্দায় ৮৩ বছর বয়সে মারা যান। জিন এল আবিদিন বেন আলির পতন শুধু তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। একজন তরুণ পথের বিক্রেতার আত্মাহুতিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া গণআন্দোলন একটি দীর্ঘমেয়াদি সরকারের পতন ঘটায় এবং আরব বসন্তের সূচনা করে, যার প্রভাব পরবর্তী কয়েক বছরে বহু দেশের রাজনীতিতে গভীর পরিবর্তন এনে দেয়।
৫. ফের্দিনান্দ মার্কোসের পতন: জনতার আন্দোলনে যেভাবে শেষ হলো ফিলিপাইনের ২০ বছরের শাসন?
ফের্দিনান্দ এড্রালিন মার্কোস সিনিয়র ছিলেন ফিলিপাইনের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট। ১৯৬৫ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি প্রায় ২০ বছর দেশ শাসন করেন। শুরুতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রশংসিত হলেও পরবর্তীতে দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং সামরিক আইন জারির কারণে তিনি ব্যাপক সমালোচিত হন। ১৯৮৬ সালের People Power Revolution (EDSA Revolution)-এর মাধ্যমে তার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। এটি বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল অহিংস গণআন্দোলনের একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। ফের্দিনান্দ মার্কোস ১৯৬৫ সালে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রথম কয়েক বছরে তিনি—সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো নির্মাণে জোর দেন। কৃষি ও শিল্প উন্নয়নের উদ্যোগ নেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিপাইনের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন।
১৯৬৯ সালে তিনি দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। মার্কোস সরকারের অন্যতম প্রধান সমালোচক ছিলেন বেনিগনো “নিনয়” অ্যাকুইনো জুনিয়র। দীর্ঘ নির্বাসনের পর ২১ আগস্ট ১৯৮৩ তিনি দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই ম্যানিলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে এবং সরকারবিরোধী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৮৬ সালে জনতার আন্দোলন ও সেনাবাহিনীর সমর্থন হারানোর পর ফের্দিনান্দ মার্কোস ও তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় হাওয়াই চলে যান। একই দিনে কোরাজন অ্যাকুইনো ফিলিপাইনের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। এর মাধ্যমে মার্কোসের দুই দশকের শাসনের অবসান ঘটে। ফের্দিনান্দ মার্কোস ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে ৭২ বছর বয়সে মারা যান। বহু বছর পর তার মরদেহ ফিলিপাইনে ফিরিয়ে আনা হয় এবং ২০১৬ সালে Libingan ng mga Bayani (জাতীয় বীরদের সমাধিক্ষেত্র)-এ দাফন করা হয়, যা দেশজুড়ে বিতর্কের জন্ম দেয়।
৬. নিকোলাই চাউশেস্কুর পতন: যেভাবে শেষ হয় রোমানিয়ার ২৪ বছরের কমিউনিস্ট শাসন
নিকোলাই চাউশেস্কু ছিলেন রোমানিয়ার কমিউনিস্ট শাসক, যিনি ১৯৬৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত টানা ২৪ বছর দেশ পরিচালনা করেন। শুরুতে জাতীয়তাবাদী নীতি ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কারণে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও, পরবর্তীতে একনায়কতান্ত্রিক শাসন, অর্থনৈতিক সংকট, ব্যক্তিপূজা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনি ব্যাপক সমালোচিত হন। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর মাসে মাত্র কয়েক দিনের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার শাসনের অবসান ঘটে। এটি পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসনের পতনের অন্যতম নাটকীয় ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। ১৯৬৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হওয়ার পর নিকোলাই চাউশেস্কু রোমানিয়ার সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় এসে তিনি— সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু নীতির বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করেন। শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দেন। জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বার্তা প্রচার করেন। ১৯৮৯ সালে রোমানিয়ার তিমিশোয়ারা (Timișoara) শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভ দমন করতে গুলি চালালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েক দিনের মধ্যেই আন্দোলন রাজধানী বুখারেস্টে ছড়িয়ে পড়ে। ২১ ডিসেম্বর ১৯৮৯, চাউশেস্কু রাজধানী বুখারেস্টে একটি জনসমাবেশে ভাষণ দিতে যান। রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার চলাকালে উপস্থিত জনতার একটি অংশ তার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শুরু করে। এটি ছিল বহু বছরের মধ্যে প্রথম প্রকাশ্য ঘটনা, যেখানে তার কর্তৃত্বকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করা হয়। এই ঘটনার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৮৯ সালের ২২ ডিসেম্বরে সেনাবাহিনীর বড় অংশ বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানায়। চাউশেস্কু ও তার স্ত্রী হেলিকপ্টারে করে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা আটক হন। আটকের পর একটি সামরিক ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচার অনুষ্ঠিত হয়। ২৫ ডিসেম্বর ১৯৮৯, নিকোলাই ও এলেনা চাউশেস্কুকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং একই দিন গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের প্রক্রিয়া পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মহলে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নিয়ে বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। চাউশেস্কুর পতনের পর রোমানিয়ায় কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটে। নিকোলাই চাউশেস্কুর পতন পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসনের অবসানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মাত্র কয়েক দিনের গণঅভ্যুত্থান, জনঅসন্তোষ এবং সেনাবাহিনীর অবস্থান পরিবর্তনের ফলে ২৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তার পতন শুধু রোমানিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসই বদলে দেয়নি, বরং শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের রাজনৈতিক রূপান্তরেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে রয়েছে।
৭. স্লোবোদান মিলোশেভিচের পতন: যেভাবে শেষ হলো সার্বিয়ার সবচেয়ে বিতর্কিত শাসনের এক অধ্যায়
স্লোবোদান মিলোশেভিচ ছিলেন সার্বিয়া ও পরে যুগোস্লাভিয়ার অন্যতম বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতা। ১৯৮৯ সালে সার্বিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসে তিনি ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করেন। তার শাসনামলে বলকান অঞ্চলে একাধিক যুদ্ধ, জাতিগত সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতি ও রাজনীতিকে গভীর সংকটে ফেলে। ২০০০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতা হারান এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হন। স্লোবোদান মিলোশেভিচ ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে সার্বিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। ক্ষমতায় এসে তিনি সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন। যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের সময় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০-এর দশকে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে গেলে একের পর এক সংঘাত শুরু হয়। আন্তর্জাতিক মহলে মিলোশেভিচের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, সার্ব বাহিনীর কর্মকাণ্ডে জাতিগত নিধন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের বিচার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে চলমান অবস্থায় তার মৃত্যু হয়; তাই আদালতের চূড়ান্ত রায়ে তিনি দোষী বা নির্দোষ—কোনোটিই ঘোষিত হয়নি। যুদ্ধের কারণে সার্বিয়া ও যুগোস্লাভিয়ার ওপর কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ১৯৯৮–১৯৯৯ সালে কসোভোতে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। জনগণের ব্যাপক আন্দোলন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর পূর্ণ সমর্থন হারানোর পর মিলোশেভিচ নির্বাচনের ফল মেনে নিতে বাধ্য হন। এর মাধ্যমে তার এক দশকেরও বেশি সময়ের শাসনের অবসান ঘটে। ২০০১ সালে সার্বিয়ার কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফর্মার যুগোস্লাভিয়া (ICTY)-এ হস্তান্তর করা হয়। ১১ মার্চ ২০০৬, হেগের কারাগারে বিচারাধীন অবস্থায় ৬৪ বছর বয়সে স্লোবোদান মিলোশেভিচ মারা যান।
৮. ওমর আল-বশিরের ৩০ বছরের শাসন ও পতন
ওমর হাসান আহমদ আল-বশির ছিলেন সুদানের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি শাসক। ১৯৮৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে তিনি প্রায় ৩০ বছর দেশ শাসন করেন। তার শাসনামল ছিল গৃহযুদ্ধ, দারফুর সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের জন্য ব্যাপকভাবে আলোচিত। ২০১৯ সালে টানা কয়েক মাসের গণআন্দোলন এবং সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তার শাসনের অবসান ঘটে। ১৯৮৯ সালের ৩০ জুন, কর্নেল ওমর আল-বশির রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সাদিক আল-মাহদির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ক্ষমতায় এসে তিনি— সংবিধান স্থগিত করেন। রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম সীমিত করেন। সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতা বাড়ান। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। আল-বশিরের শাসনামলে— দক্ষিণ সুদানের সঙ্গে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে। ২০০৫ সালে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১১ সালে গণভোটের মাধ্যমে দক্ষিণ সুদান স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তবে একই সময়ে সুদান গুরুতর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। ২০০৩ সালে সুদানের দারফুর অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। ১১ এপ্রিল ২০১৯ সালে টানা কয়েক মাসের বিক্ষোভের পর সুদানের সেনাবাহিনী ঘোষণা দেয় যে— ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে আটক করা হয়েছে। একটি সামরিক অন্তর্বর্তী পরিষদ (Transitional Military Council) গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তার ৩০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। ওমর আল-বশিরের পতন আফ্রিকার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অর্থনৈতিক সংকট, দীর্ঘদিনের জনঅসন্তোষ এবং গণআন্দোলনের মুখে তার তিন দশকের শাসনের অবসান ঘটে। তবে তার পতনের পরও সুদান স্থিতিশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে দেশটি আজও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত এবং মানবিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে।
৯. ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতাচ্যুতি বদলে দিল ইউরোপের ভূরাজনীতি?
ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ছিলেন ইউক্রেনের চতুর্থ প্রেসিডেন্ট। ২০১০ সালে নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশ পরিচালনা শুরু করেন। তার শাসনামল ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও রাশিয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত। তবে ২০১৩–২০১৪ সালের ইউরোমাইদান (Euromaidan) আন্দোলন তার সরকারের পতন ঘটায় এবং ইউক্রেনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ২০১০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হন। ক্ষমতায় এসে তিনি- ইউক্রেনের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দেন। রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেন। শিল্প ও জ্বালানি খাতে সংস্কারের কথা বলেন। তবে তার সরকারের বিরুদ্ধে দ্রুত দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। ২১ নভেম্বর ২০১৩, রাজধানী কিয়েভের স্বাধীনতা চত্বর (মাইদান নেজালেজনোস্তি)-তে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ শুরু করে। প্রথমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হলেও পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে ইয়ানুকোভিচ কিয়েভ ত্যাগ করেন। একই দিন ইউক্রেনের সংসদ (ভারখোভনা রাদা) তাকে কার্যত দায়িত্ব পালনে অক্ষম ঘোষণা করে এবং নতুন নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয়। ইয়ানুকোভিচ পরে রাশিয়ায় চলে যান এবং সেখান থেকে তিনি দাবি করেন যে, তাকে অবৈধভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনের নতুন নেতৃত্ব এবং আন্দোলনকারীরা ঘটনাটিকে গণআন্দোলনের ফল ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্ণনা করে। এই ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা রয়েছে। ইয়ানুকোভিচের ক্ষমতাচ্যুতির পর ইউক্রেনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের পতন শুধু একজন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাচ্যুতি ছিল না; এটি ইউক্রেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং ইউরোপের ভূরাজনীতিকে নতুন পথে নিয়ে যায়। ইউরোমাইদান আন্দোলন গণতন্ত্র, দুর্নীতিবিরোধী দাবি এবং আন্তর্জাতিক অভিমুখ নিয়ে ইউক্রেনের গভীর অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে সামনে নিয়ে আসে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ—বিশেষ করে ক্রিমিয়া ও পূর্ব ইউক্রেনের সংঘাত—আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।
১০. যেভাবে আশরাফ গনির পতন হয়েছিল
আশরাফ গনি ছিলেন আফগানিস্তানের সর্বশেষ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রেসিডেন্ট। ২০১৪ সালে প্রথমবার এবং ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। একজন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা, দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার এবং উন্নয়নমূলক নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে ২০২১ সালের আগস্টে তালেবানের দ্রুত অগ্রযাত্রার মুখে তার সরকার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ভেঙে পড়ে। এর মাধ্যমে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত দুই দশকের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবসান ঘটে। আশরাফ গনি ২০১৪ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর জাতীয় ঐক্যের সরকারের (National Unity Government) নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ক্ষমতায় এসে তিনি— দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। সরকারি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন। শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দেন। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখেন। ২০০১ সালে তালেবান সরকার পতনের পরও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম চলতে থাকে। গনির শাসনামলে— আফগান নিরাপত্তা বাহিনী ও তালেবানের মধ্যে নিয়মিত সংঘর্ষ হয়। গ্রামীণ এলাকার বড় অংশে তালেবানের প্রভাব বাড়তে থাকে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে যায়। ২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র বাহিনীর সেনা প্রত্যাহার শুরু হলে তালেবান দ্রুত একের পর এক প্রাদেশিক রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকে। আগস্ট মাসে— বহু প্রদেশ খুব অল্প প্রতিরোধের মধ্যেই তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক সদস্য আত্মসমর্পণ বা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়। ১৫ আগস্ট ২০২১ সালে তালেবান রাজধানী কাবুলে প্রবেশ করে। একই দিন আশরাফ গনি দেশ ছেড়ে চলে যান। পরে তিনি জানান, রক্তপাত এড়ানোর উদ্দেশ্যেই তিনি দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে তার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আফগানিস্তান ও আন্তর্জাতিক মহলে ভিন্নমত এবং ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। গনির দেশত্যাগের পর— আফগান সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়ে। তালেবান প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের নিয়ন্ত্রণ নেয়। হাজার হাজার মানুষ দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেন। কাবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাগুলো বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। আশরাফ গনির পতন ছিল আধুনিক আফগানিস্তানের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড়। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত সরকার ভেঙে পড়ে এবং তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে। এই ঘটনা শুধু আফগানিস্তানের রাজনীতিই বদলে দেয়নি, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং সন্ত্রাসবাদবিষয়ক বৈশ্বিক আলোচনায়ও গভীর প্রভাব ফেলেছে। তার ক্ষমতাচ্যুতি দেখিয়েছে যে, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সহায়তা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ঐক্য, কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হলে একটি সরকার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়তে পারে।