উত্তর চট্টগ্রামের রাউজানের মেধাবী পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল আলম নুরু হত্যার ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও বিচারের মুখ দেখেনি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এই হত্যার নেপথ্যের পরিকল্পনা, পেশাদারি কায়দায় অপহরণ এবং নির্মম হত্যার বিবরণ উঠে এসেছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অভিযোগ-চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের সাবেক এমপি ফ্যাসিস্ট ফজলে করিম চৌধুরী এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হলেও তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে পারেনি প্রশাসন।
পরিবার ও বিএনপি তৃমূল নেতাদের অভিযোগ, ফজলে করিমের নির্দেশে নুরুকে হত্যা করা তিন পুলিশ কর্মকর্তা চট্টগ্রামের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) নূরে আলম মিনা, রাউজান থানার সাবেক ওসি কেফায়েত উল্লাহ ও উপপরিদর্শক (এসআই) জাবেদের বিচার হয়নি। রাউজান বিএনপির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দ্রুত নুরু হত্যার বিচার করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
২০১৭ সালের ২৯ মার্চ, রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে চট্টগ্রামের চকবাজার থানাধীন চন্দনপুরা এলাকায় নিজ বাসায় ঘুমিয়ে ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম নুরু। রাউজান থানার এসআই জাবেদ হঠাৎ তার বাসায় এসে তাকে তুলে নিয়ে যায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর সরাসরি নির্দেশে রাউজান থানার ওসি কেফায়েত উল্লাহ এই অপারেশনে নেতৃত্ব দেন। নুরুর ভাগ্নে রাশেদুল ইসলাম বাসার দরজা খোলার পর, ঘুমন্ত অবস্থায় নুরুকে বিছানা থেকে টেনে তুলে হাতকড়া পরান এসআই জাবেদ।
পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু নুরুর পরিবারের লোকজন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখতে চাইলে তিনি দেখাতে পারেননি। সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসে করে প্রথমে নুরুকে নেওয়া হয় রাউজানের নোয়াপাড়া কলেজ ক্যাম্পাসে, যেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা। সেখান থেকে তাকে আরেকটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয় নোয়াপাড়া পুলিশ ক্যাম্পে। সেখানেই কাপড় দিয়ে চোখ-মুখ বেঁধে, রশি দিয়ে হাত বেঁধে শুরু হয় ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতন। দীর্ঘ নির্যাতনের একপর্যায়ে নূরুর মাথায় গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।
পরে তার লাশ ফেলে যাওয়া হয় রাউজান উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলারঘাট এলাকায়, কর্ণফুলী নদীর তীরে। পরদিন ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ সকালে পুলিশ সেখান থেকে নুরুর মরদেহ উদ্ধার করে। নুরুর স্ত্রী সুমি আক্তার দীর্ঘদিনের চেষ্টা ও সংগ্রামের পর, ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন এমপি ফজলে করিম চৌধুরী, রাউজান থানার সাবেক ওসি কেফায়েত উল্লাহ, এসআই জাবেদ, নোয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক ইনচার্জসহ মোট ১৭ জন।
তবে মামলা দায়েরের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। উল্টো নুরু হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকা অভিযুক্তদের কয়েকজনকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে, যা ন্যায়বিচারপ্রত্যাশী পরিবারটির জন্য আরও বেদনাদায়ক বলে জানিয়েছেন সুমি আক্তার।
এই হত্যাকাণ্ড ছিল একটি পরিকল্পিত ও পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সহিংসতা। নির্মম হত্যার ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও, কোনো বিচার না হওয়া প্রমাণ করে বিচারব্যবস্থা কতটা পক্ষপাতদুষ্ট ছিল বা চাপের মধ্যে কাজ করছে। প্রশ্ন উঠেছে, একজন রাজনৈতিক নেতার হত্যার বিচার যদি এত দিনেও না হয়, তার হত্যাকারী ফ্যাসিস্ট ফজলে করিম চৌধুরীর লোকেরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। চট্টগ্রামের তৎকালীন এসপি নূরে আলম মিনা পলাতক রয়েছেন।
সর্বশেষ রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে কর্মরত থাকাকালীন ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়েই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় পরবর্তীতে সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) নূরে আলমকে গত ২০২৫ ১ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে বরখাস্ত করে। সেই থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী মিনা চাকরিরত অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার নাগরিক ছিলেন, সেই সুবাদে সেখানে গড়ে তুলেছেন হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়। রাউজানের তৎকালীন ওসি মোহাম্মদ কেপায়েত উল্লাহ বর্তমানে কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক (ওসি) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
অন্যদিকে এসআই শেখ মো. জাবেদ বর্তমানে কোথায় চাকরিরত, সেই তথ্য পাওয়া যায়নি। পাঁচ বছর পর ৩ পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নূরুর লাশ উদ্ধারের ঘটনার পাঁচ বছর পর ২০২২ সালের ২৭অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আজিজ আহমেদ ভূঞার আদালতে মামলা করেন কৃষকদলের কেন্দ্রীয় নেতা মো. মিজানুর রহমান।
মামলার আবেদনে তিন পুলিশ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়। তারা হলেন-সাবেক চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা, রাউজান থানার সাবেক ওসি মো. কেফায়েত উল্লাহ এবং নোয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এসআই শেখ মো. জাবেদ। এতে আরও ৪-৫ জন পুলিশ সদস্যকে অজ্ঞাত আসামি হিসেবে রাখা হয়।
মামলার বিষয়ে বাদীর আইনজীবী মাহফুজার রহমান বলেন, আসামিরা সে সময় চট্টগ্রাম জেলায় কর্মরত থাকায় ভয়ে ও প্রাসঙ্গিক কিছু কারণে মামলা করা যায়নি। এখন বাদী মিজানুর রহমান সাহেব খোঁজ নিয়ে জানলেন যে আসামিরা চট্টগ্রাম জেলায় আর নেই। পুলিশই তাকে নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করে লাশ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দিয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় ৩১ মার্চ রাতে রাউজান থানায় উপপরিদর্শক কামাল হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। নুরু হত্যা মামলাটির কোনো সাক্ষী না থাকার কারণে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সাক্ষীর কারণে অনেকটা শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না এই আলোচিত মামলার বিচার কাজ।