বিএনপি সরকারই পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজের কাজে হাত দেবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, এই বিএনপি সরকারই পদ্মা ব্যারাজের কাজে হাত দেবে, ইনশাল্লাহ তিস্তা ব্যারাজেও হাত দেবে। আজকের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর নেতৃত্বেই তিস্তা নিয়ে নানা কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। তাই কাজ যদি কেউ করে থাকে, ডেলিভারি যদি কেউ করে থাকে, সেটা বিএনপিই করেছে। গাজীপুরে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা পত্রিকায় দেখেছেন, কয়েকদিন আগে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের উত্তর অঞ্চল, দক্ষিণ অঞ্চলে বিশেষ করে রাজশাহীতে পদ্মা নদীতে পদ্মা ব্যারাজ তৈরি করবো। সীমান্তের ওপারে ব্যারাজ তৈরি করে বিভিন্নভাবে পানি সরিয়ে নিচ্ছে কিন্তু খরা মৌসুমে আমরা পানি কম পাচ্ছি। এই ব্যারাজটি আমরা এই জন্য করতে চাচ্ছি, যাতে বর্ষায় বলুন বা খরা মৌসুম বলুন, আমাদের দেশের মানুষ বা কৃষক যেন ঠিক সময়ে পানি পায়। আরেকটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে ফারাক্কা বাদ হওয়ার কারণে সমুদ্রের পানি দক্ষিণ অঞ্চলে ঢুকছে।
এতে সুন্দরবনসহ ওই সকল অঞ্চলে লবণাক্ত পানি বেশি পরিমাণে চলে আসায় বিভিন্ন গাছপালা নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন পশু বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কাজেই আমাদের ব্যারাজটা নির্মাণ করতে হবে এবং ব্যারেজের মধ্যে আমরা পানি ধরে রাখবো। বর্ষার বাড়তি পানি আমরা ধরে রাখবো। খরা মৌসুমে সেটি কাজে লাগবে। তাই আমরা আমাদের নির্বাচনি ইস্তেহারে উল্লেখ করেছি, আমরা খাল খনন কর্মসূচি শুরু করবো। আমরা আমাদের সেই খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছি। এই খাল খনন কর্মসূচির সাথে মানুষের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই খাল খননের সাথে কৃষি জড়িত। তাই যেভাবেই হোক আমাদেরকে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করতে হবে।
সমাবেশে বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মিজানুর রহমান। সমাবেশের শুরুতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর নির্মিত ভিডিও তথ্যচিত্র উপস্থাপন করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা স্মারক দেয়া করা হয়।
এর আগে সকালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুরে আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। এসময় তিনি বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) সদস্যদের শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শৃঙ্খলার সামান্য ঘাটতিও জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে আনসার-ভিডিপি ভবিষ্যতে একটি প্রযুক্তিনির্ভর মানবিক ও সামাজিক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে কোনো দেশেই যে কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য ‘চেইন অব কমান্ড’ ও ‘ডিসিপ্লিন’ মেনে চলা অনিবার্য ও অবশ্য পালনীয় নীতি। এই দুইটি বিষয়ে সামান্যতম অবহেলা থাকলে কোনো বাহিনী প্রকৃত অর্থে সুশৃঙ্খল বাহিনী হয়ে উঠতে পারে না। আপনাদের এ বিষয়টি গভীরভাবে মনে রাখতে হবে। কোনো বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলার অভাব দেখা দিলে সেই বাহিনী সম্পর্কে জনমনে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়। পেশাদারিত্ব, জনসম্পৃক্ততা এবং তৃণমূল পর্যায়ে নিরাপত্তা ও সামাজিক উন্নয়নে অবদানের মাধ্যমে আনসার ও ভিডিপি একটি বহুমাত্রিক ও জনমুখী বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাহিনীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা থানা পাহারা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রেখেছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি বাহিনীটি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দেয়ার ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
তিনি বলেন, ব্যাটালিয়ন আনসার, অঙ্গীভূত আনসার, থানা বা উপজেলা আনসার এবং ভিডিপি-টিডিপি,এই প্রতিটি শক্তি সমন্বিতভাবে দেশের নিরাপত্তা ও তৃণমূলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে। আমি মনে করি, এই কাঠামোই বাহিনীটিকে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলভিত্তিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সরকারি দপ্তর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্প কলকারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নিরাপত্তা প্রদান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন মোকাবিলা ও মাদক বিরোধী কার্যক্রমসহ নানা সামাজিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ও সম্প্রীতি জোরদারে আনসার ভিডিপির সক্রিয় ভূমিকা রাখার বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বাহিনী কেবল নিরাপত্তা রক্ষা নয়, সামাজিক পরিবর্তনেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিনি বলেন, ‘আনসার-ভিডিপি মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, সিক্স জি ওয়েল্ডিংসহ বহুমাত্রিক চাহিদাভিত্তিক আধুনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে যা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আনসার-ভিডিপি বর্তমানে একটি নির্ভরযোগ্য ‘ফাস্ট রেসপোন্ডার’ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। বন্যা, অগ্নিকা-সহ বিভিন্ন দুর্যোগে এই বাহিনীর সাহসিকতা, দ্রুততা ও মানবিক দায়বদ্ধতা দৃষ্টান্তমূলক। একইসঙ্গে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং, সোলার প্যানেল এবং বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নেয়ার মাধ্যমে এই বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যগণ টেকসই উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য শেষে একাডেমিতে আনসার ও ভিডিপি বাহিনীর সদস্যদের তাঁত ও বুনন শিল্প, মৃৎ শিল্প, গবাদি পশু খামার, জাপানি ভাষা শিক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ঘুরে ঘুরে পরিদর্শন করেন। সদস্যরা কিভাবে কাজ করছে সে সম্পর্কে তিনি অবহিত হন। অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, রেল প্রতি মন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এটিএম শামসুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানসহ সংসদ সদস্য ও সরকারি ঊধর্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী সকাল ১০টায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬ তম জাতীয় সমাবেশে যোগ দেন। তিনি শহীদদের স্মৃতি সৌধে পুস্পস্তবক অর্পণ করে কর্মসূচি শুরু করেন। এর আগে সফিপুরে আনসার ভিডিপি একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।