দেশে প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করাই তার সরকারের লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, একটি ন্যায়ভিত্তিক ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। তিনি বলেন, সেবা প্রদান জনগণের প্রতি করুণা নয় বরং জনগণের সেবা নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব। আমাদের লক্ষ্য একটি দুর্নীতিমুক্ত, হয়রানিমুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা, যা দেশের টেকসই উন্নয়নকে আরো ত্বরান্বিত করবে।
রাজধানীতে মঙ্গলবার ভূমিসেবা মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী থেকে শুরু করে এই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা এবং কর্মচারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, সেবা প্রদান জনগণের প্রতি করুণা নয়, বরং জনগণের সেবা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব বলেই আমি মনে করি। আমাদের লক্ষ্য একটি দুর্নীতিমুক্ত, হয়রানিমুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা, যা দেশের টেকসই উন্নয়নকে আরো ত্বরান্বিত করবে।
সারাদেশে ভূমিসেবা মেলার উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সকল জেলা উপজেলায় শুরু হওয়া এই আয়োজনের মাধ্যমে জনগণ উপকৃত হবে বলেই তার বিশ্বাস। কারণ মেলায় ই-নামজারি, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান, রেকর্ড সংশোধন, খতিয়ান গ্রহণ এবং ভূমি সংক্রান্ত যে কোনো অভিযোগ নিষ্পত্তির সুবিধা থাকছে। অনুষ্ঠানে আপনাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আমি আনন্দিত ও গর্বিত। একটি ন্যায়ভিত্তিক, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব ভূমি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। আমি এই ভূমি মেলার সাফল্য কামনা করছি।
ঢাকার তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবন মিলনায়তনে তিন দিনব্যাপী এই ভূমিসেবা মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পর প্রধানমন্ত্রী মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। সমাজ কল্যাণ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন, কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন, আইন ও বিচার মন্ত্রী মো.আসাদুজ্জামান, ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিবসহ সংসদ সদস্য, সরকারের ঊধর্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ভূমির দক্ষ ব্যবস্থাপনা সময়ের দাবি : প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে আসছে। ফলে জমির অর্থনৈতিক মূল্য যেমন বাড়ছে, তেমনি জমি নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা এবং জটিলতাও বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধ ব্যক্তি ও পরিবারের শান্তি নষ্ট করার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়ন কর্মকা-েও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার, নির্ভুল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা বর্তমানে সময়ের অপরিহার্য দাবি।
তিনি বলেন, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে নির্ভুল ভূমি রেকর্ড প্রস্তুত করতে ভূমি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। একইসঙ্গে ভূমি প্রশাসনের প্রায় সকল সেবাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসে নাগরিকদের জন্য সেবাপ্রাপ্তি আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, যেখানে ভূমিসেবা গ্রহণের জন্য মানুষকে আর অযথা অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না, দুর্নীতি বা হয়রানির শিকার হতে হবে না।
নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে : বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের বিষয়টি বিএনপির ৩১ দফা এবং সর্বশেষ নির্বাচনি ইশতেহারেও ছিল। আজ থেকে সারাদেশে তিন দিনব্যাপী ভূমিসেবা মেলা আয়োজনের মাধ্যমে সরকার জনগণের কাছে দেয়া আরো একটি নির্বাচনি ইশতেহার পূরণ করেছে। আলহামদুলিল্লাহ।
সরকার এভাবে পর্যায়ক্রমে নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিটি দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণকে দেয়া ওয়াদা পূরণ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, শুধুমাত্র জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়েই নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট দেশের জনগণ বর্তমানে রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে তাদের অধিকারের প্রতিফলন দেখতে চায়। এ কারণেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম সপ্তাহ থেকেই নির্বাচনি ইশতেহার এবং জুলাই সনদের প্রতিটি দফা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
অধিকাংশ মামলা জমিজমা সংক্রান্ত : প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ের আদালতগুলোতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মিলিয়ে ৪৭ লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন। এরমধ্যে জমিজমা সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাই বেশি। এই মুহূর্তে সরকারের সামনে প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে আদালতে বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি। তবে প্রচলিত আদালতের বাইরেও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গ্রাম আদালত কিংবা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মত আইনানুগ মাধ্যম অবলম্বনের দিকে আরো জোর দেওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি। তাতে একদিকে বিরোধ নিষ্পত্তিতে অল্প সময় লাগবে, অন্যদিকে অনেক্ষত্রেই বিরোধ শত্রুতার রূপ নেবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি উক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শক্তি দিয়ে শান্তি রক্ষা করা যায় না, বোঝাপড়ার মাধ্যমেই এটি অর্জন করা সম্ভব। সুতরাং,বিশেষ করে জমিজমা সংক্রান্ত মামলা বা দেওয়ানি মামলাগুলোতে পর্যায়ক্রমে আলোচনা, মধ্যস্থতা, সালিশ, কিংবা সমঝোতার মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পথ কার্যকর করা গেলে একদিকে আদালতে বিচারাধীন মামলার জট কমবে, অপরদিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করাও সহজ হবে।
তিনি বলেন, জমি বা ভূমি শুধু একটুকরো সম্পদ নয় বরং মানুষের জীবনে এক ধরনের নিরাপত্তা, নির্ভরতা, অর্থনৈতিক স্থিতি, জীবিকা এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি। এই উপলব্ধি থেকেই ভূমি ব্যবস্থাপনাকে হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত করার অঙ্গীকার নিয়ে জনগণের দোরগোড়ায় রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার কাজ করছে।
সেবা গ্রহীতাদের সুযোগ : বক্তব্যের শুরুতে ভূমি সংক্রান্ত সেবা গ্রহীতাদের সুযোগ সুবিধা দিতে সরকারের কার্যক্রম তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মালিকানা, খাজনা, দলিল, খতিয়ান, দাগ, পর্চা, নামজারি, জমা-খারিজ, মৌজা, সি-এস, আর-এস বা ডি-এসৃ এইসব বিষয়ে নিজেদের মালিকানা হালনাগাদ রাখতে মানুষকে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে আসতে হত। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সাথে ভূমি ব্যবস্থাপনাও আধুনিক হয়েছে। সেবাগ্রহীতারা জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়গুলো বর্তমানে ঘরে বসেই অনলাইনে সম্পন্ন করার সুযোগ পাচ্ছেন। এমনকি যারা অনলাইনে নিজেরা জমিজমার খাজনা প্রদান কিংবা প্রয়োজনীয় কার্যক্রমগুলো করতে সক্ষম নন, তাদের জন্য রয়েছে ভূমি সহায়তা সেবা কেন্দ্র রয়েছে।
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পরিচালনায় দেশের ৬১টি জেলায় ৮৯৩টি ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র চালু হওয়ার তথ্য অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত সেবামূল্যের বিনিময়ে নাগরিকরা সহজেই ভূমিসেবার আবেদন করতে পারছেন এবং সরকারি ফি পরিশোধ করতে পারছেন। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এ ধরনের আরো ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।এর পাশাপাশি নাগরিকদের হাতের মুঠোয় ভূমিসেবা পৌঁছে দিতে চালু করা হয়েছে মোবাইল অ্যাপ ভূমি।
ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিক হলে বিরোধ নিষ্পত্তি সহজ হবে : প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি মনে করি, ভূমি-জমি ব্যবস্থাপনা যতবেশি আধুনিক এবং প্রযুক্তি নির্ভর করা যায়, জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পথও তত বেশি সহজ হয়ে যায়। আমি আশা করি, জমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনলাইন সুবিধা নিশ্চিত করায় জমিজমা সংক্রান্ত দুর্ভোগ অনেকটা লাঘব হবে। একইসঙ্গে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ভূমি অফিসগুলোতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্মও কমবে। চলমান এই ভূমি মেলা আধুনিক ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জনগণের নিজেদের দায়দায়িত্ব সম্পর্কে আরো সচেতন করবে।
ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এবং ভূমি সচিব এএসএম সালেহ উদ্দিন বক্তব্য দেন।
শিশুদের সঙ্গে প্রাণোচ্ছ্বল প্রধানমন্ত্রী : সকালে ১০টায় ভূমিসেবা মেলা উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভূমি ভবনে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে যান। মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধায়নের কেন্দ্রটির শিশুদের সঙ্গে প্রাণোচ্ছ্বল সময় কাটিয়েছেন তারেক রহমান। সেখানে শিশুদের সঙ্গে হাত মেলান তারেক রহমান; তাদের সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেখানে কেকও কাটেন। শিশুরা নিজেদের আঁকা ছবি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে থাকা মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পেয়ে শিশুরা এত খুশি হয়েছিল যে, তারা চারপাশে ঘিরে সেই খুশির আনন্দ প্রকাশ করছিল। প্রধানমন্ত্রীও শিশুদের কাছে পেয়ে অন্যরকম কিছুটা সময় কাটিয়েছেন। তাদের সাথে নিয়ে কেক কেটেছেন। শিশুদের বিভিন্ন রকমের চকোলেট, টফি, ললিপপ নিজ হাতে দিয়েছেন, দিয়েছেন উপহার। চকোলেট-টফি দিতে দিকে প্রধানমন্ত্রী বলছিলেন, আর কেউ কি বাকি আছে? শিশু দিবাযতœ কেন্দ্রে’ আগে থেকেই একটি কেক রাখা ছিল। কেক দেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে কার জন্ম দিন বলো তো? একেক জনকে বলতে শোনা যায়, আংকেল আমার, আংকেল আমার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে তোমাদের সবার জন্মদিন। আসো আমরা এক সাথে কেক কাটি। এরপর শিশুদের সঙ্গে নিয়ে কেক কাটেন প্রধানমন্ত্রী। শিশুরা আনন্দে বলছিল হ্যাপি হ্যাপি, হ্যাপি ডে, হ্যাপি হ্যাপি বার্থ ডে ।
শিশুদের কীভাবে যত্ন নেওয়া হয় তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের কর্মকর্তা মাহিয়া তাসনুভ তামান্না। সে সময় শিশুদের কী কী খাবার দেওয়া হয় তা জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। ছোট্ট শিশু আরিবা বলে, “প্রধানমন্ত্রী আংকেলকে দেখে আমি যে কী খুশি বলতে পারছি না। আংকেলের সঙ্গে মজা করে কেক খেয়েছি। আংকেলও কেক খেয়েছেন। শিশু দিবাযতœ কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১৫ মিনিটের কিছু বেশি সময় ছিলেন। এরপর তিনি শিশুদের কাছ থেকে বিদায় নেন। এই কেন্দ্রট পরিদর্শনের সময়ে ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনও উপস্থিত ছিলেন।