আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ঢাকায় অস্থায়ী পশুর হাট ইজারার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এবার ঢাকা উত্তর (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মোট ২৭টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর উদ্যোগ নেয়। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৯টি হাটের ইজারা চূড়ান্ত হয়েছে। বাকি হাটগুলোতে কাক্সিক্ষত দর না পাওয়া এবং দরপত্রে অংশগ্রহণ কম থাকায় পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
ইজারা পাওয়া হাটগুলোতে ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বেপারি ও খামারিরা পশু নিয়ে ঢাকায় আসা শুরু করেছেন। তবে পুরোপুরি বেচাকেনার পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। হাট কর্তৃপক্ষ বলছে, ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বিক্রির গতি বাড়বে।
এবারের হাট ইজারায় সবচেয়ে বেশি দরের হাট হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন উত্তরা দিয়াবাড়ি ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন বউবাজার এলাকার পশুর হাট। এখানে ইজারার মূল্য উঠেছে ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা, যা এবারের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় এলাকা, যোগাযোগ সুবিধা এবং ক্রেতা-বিক্রেতার চাপ বেশি থাকায় এই হাটে দর তুলনামূলকভাবে বেশি উঠেছে। প্রতি বছরই এই এলাকাটি রাজধানীর অন্যতম বড় পশুর হাট হিসেবে পরিচিত।
অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায় সবচেয়ে বেশি দর উঠেছে কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত হাটে। এই হাটের ইজারা মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
এছাড়া পোষ্টগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশের বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ের হাটে ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা চূড়ান্ত হয়েছে। এসব হাটকে দক্ষিণ সিটির গুরুত্বপূর্ণ পশুর বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীনে থাকা হাটগুলোর মধ্যে দর উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে। মিরপুর, কালশী, বাড্ডা, খিলক্ষেত, বনরূপা ও বড় বেরাইদসহ বিভিন্ন এলাকায় হাট ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। মিরপুর সেকশন-৬ এর ইস্টার্ন হাউজিং সংলগ্ন খালি জায়গার হাট ইজারা হয়েছে ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকায়। মিরপুর কালশী বালুর মাঠ সংলগ্ন এলাকায় ইজারা দাঁড়িয়েছে ৩০ লাখ ১১ হাজার টাকার মতো। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন হাটে ইজারার মূল্য ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। খিলক্ষেত, বনরূপা ও বাড্ডা এলাকার হাটগুলোতেও ১ কোটি থেকে ৩ কোটি টাকার মধ্যে দর চূড়ান্ত হয়েছে।
ডিএনসিসির জনসংযোগ বিভাগসূত্রে জানা গেছে, যে ১০টি হাটে সর্বোচ্চ দরদাতা পাওয়া গেছে, তাদের ইতোমধ্যে জায়গা বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে ৬টি হাটে কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
এবার কয়েকটি হাটে কাঙ্খিত দর না পাওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এরমধ্যে রয়েছে খিলক্ষেত বাজার সংলগ্ন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের জায়গা, মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার সংলগ্ন এলাকা, বছিলা ৪০ ফুট রাস্তা সংলগ্ন খালি জায়গা, ভাটারার সুতিভোলা খাল সংলগ্ন এলাকা, উত্তরা স্লুইচগেট পর্যন্ত অংশ এবং মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠ। এইসব স্থানে দরপত্র প্রত্যাশিত মানে না পৌঁছানোয় পুনঃদরপত্র চলমান রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন দরপত্রে কাঙ্খিত মূল্য পেলে এসব হাটও ইজারার আওতায় আনা হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মোট ১১টি হাট ইজারার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়। এরমধ্যে এখন পর্যন্ত ৯টি হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ২টি হাটে কাঙ্খিত দর না পাওয়ায় সেগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে। ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসব হাট নিয়ে পরবর্তী করণীয় জানতে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। সেই মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
ইজারা পাওয়া হাটগুলোতে এখন ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে প্রস্তুতির কাজ। অনেক হাটেই ইতোমধ্যে গরু-ছাগল আসা শুরু করেছে। বিশেষ করে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খামারিরা পশু নিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করছেন। একাধিক হাট ইজারাদার জানিয়েছেন, এখনো পুরো বেচাকেনা শুরু হয়নি, তবে পশু রাখার জায়গা ও অবকাঠামো প্রস্তুত করা হচ্ছে। হাটগুলোতে খুঁটি, আলো, নিরাপত্তা ও পানি সরবরাহের কাজ চলছে। একজন ইজারাদার বলেন, এখন বেপারিরা পশু নিয়ে আসা শুরু করেছেন। তবে বিক্রি জমবে মূলত ঈদের কয়েকদিন আগে। তখনই মূল লেনদেন শুরু হবে।
এদিকে রাজধানীর অস্থায়ী হাটগুলোর পাশাপাশি স্থায়ী পশুর হাটগুলোতেও কোরবানির পশু বিক্রি হবে। এরমধ্যে উত্তর সিটির গাবতলী পশুর হাট এবং দক্ষিণ সিটির সারুলিয়া স্থায়ী পশুর হাট অন্যতম। এই হাটগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই বড় আকারে পশুর বাণিজ্য হয়। স্থানীয় ও দূর-দূরান্তের খামারিরা এখানে পশু নিয়ে আসেন এবং রাজধানীবাসী এখান থেকেই কুরবানির পশু কেনেন।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঈদের দিনসহ মোট পাঁচদিন রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে বেচাকেনা চলবে। এই সময়কে কেন্দ্র করেই মূল বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিবছরই দেখা যায়, ঈদের আগের তিন থেকে চার দিনে হাটগুলোতে ব্যাপক ভিড় জমে। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ী ও কর্তৃপক্ষ। এইমধ্যে হাটগুলোতে পশু আনা শুরু হয়েছে।
এদিকে হাট ব্যবস্থাপনায় এবার নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। প্রতিটি হাটে আলাদা করে নিরাপত্তা বাহিনী, সিসি ক্যামেরা এবং নির্দিষ্ট প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ রাখা হবে। এছাড়া পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভেটেরিনারি টিম এবং পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে। ঈদের সময় যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না হয়, সেজন্য আলাদা মনিটরিং সেলও কাজ করবে।
সব মিলিয়ে রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটগুলো এখন শেষ প্রস্তুতির পথে। ইজারা প্রক্রিয়া প্রায় শেষ, মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে, আর বেপারিরাও ধীরে ধীরে পশু নিয়ে আসছেন। তবে এখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি হাটের বেচাকেনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, রাজধানীর প্রতিটি হাটেই বাড়বে মানুষের ভিড়, জমবে কেনাবেচার বাজার, আর তখনই শুরু হবে আসল কুরবানির মৌসুমের উন্মাদনা।