যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইরান। তবে একই সঙ্গে তেহরান ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—‘যুদ্ধ’ এবং ‘যুদ্ধবিরতি’ একসঙ্গে চলতে পারে না; এর মধ্যে যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে হবে।
বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত হাজার হাজার বছর ধরে এই প্রণালিটি উন্মুক্ত ছিল। এটি কোনো আন্তর্জাতিক জলসীমার আওতায় পড়ে না এবং এখানে নিরাপদ নৌচলাচল মূলত ইরান ও ওমান-এর সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি ‘বাস্তবে আগ্রাসন থেকে সরে না আসে’, তাহলে প্রণালিটি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেয়া হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
সাংবাদিক নিক রবিনসন জানতে চান, নিরাপদ চলাচল বলতে কি বোঝানো হচ্ছে যে ইরান কি প্রণালি দিয়ে যাওয়া প্রতিটি জাহাজ থেকে ফি আদায় করবে না, কিংবা জাহাজ উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেবে না? জবাবে ইরানের মন্ত্রী বলেন, ইরান চায় প্রণালিটি ‘শান্তিপূর্ণ’ থাকুক।
তিনি আরও যোগ করেন, ইরান আন্তর্জাতিক রীতি ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলবে। নিরাপদ চলাচল একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয়, এবং উপসাগরকে যেন যুদ্ধজাহাজের মাধ্যমে ‘অপব্যবহার’ করা না হয়—তা ইরান মেনে নেবে না।
এর আগে গতকাল বুধবার যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ফের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে ইরান।
ইরানের অভিযোগ, যে ১০ দফা শর্তের ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তার মধ্যে তিন দফা লঙ্ঘিত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। এছাড়া ইরানে ড্রোন হামলারও অভিযোগ তুলেছে তারা। পাশাপাশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়েও শর্তখেলাপ হয়েছে বলে অভিযোগ তেহরানের।
ইরান ফের হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার কারণে বিভিন্ন দেশের তেলবাহী জাহাজগুলো ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ‘ইরান ও আমেরিকার যুদ্ধবিরতির শর্ত স্পষ্ট। হয় যুদ্ধবিরতি, নয়তো ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ অব্যাহত রাখা। দু’টি একসঙ্গে চলতে পারে না। লেবাননের গণহত্যা সমস্ত বিশ্ব দেখছে।’
তেহরানের স্পষ্ট বার্তা, ‘এখন আমেরিকার কোর্টে বল। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে কি না, তার অপেক্ষায় বিশ্ব।’
উল্লেখ্য, বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার আলোচনায় বারবার উঠে আসে একটি নাম—হরমুজ প্রণালি। ছোট একটি সমুদ্রপথ হলেও এর গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, এটিকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ “এনার্জি লাইফলাইন”।
হরমুজ প্রণালি হলো একটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথ, যা পারস্য উপসাগর-কে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগর-এর সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি মূলত দুই দেশের মাঝখানে অবস্থিত—উত্তরে: ইরান, দক্ষিণে: ওমান। এর প্রস্থ প্রায় ৩৩ কিলোমিটার, তবে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট অংশ আরও সংকীর্ণ।