গত এক দশকে মোবাইল গ্রাহক, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ডাটা খরচের ক্ষেত্রে দেশে বড় অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এখনো একটি ‘প্রযুক্তি ব্যবহারের বাজার’ বা ডিজিটাল কনজাম্পশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় নিজস্ব উচ্চ-মূল্যের তথ্যপ্রযুক্তি তৈরি, বৈশ্বিক সেবা রপ্তানি এবং মৌলিক প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বাংলাদেশ এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে।
শনিবার ‘টেলিকম খাতের ভবিষ্যৎ : নতুন সরকার কী ভাবছে’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য জানানো হয়। হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত এই আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রবির হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স সাহেদ আলম।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৫-২৬ নাগাদ দেশের মোবাইল গ্রাহক সংখ্যা ৩৯ শতাংশ বেড়ে ১৮ কোটি ৬০ লাখে উন্নীত হয়েছে। যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩৭ শতাংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে মোট জনসংখ্যার ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার ৮৬ জিবিপিএস থেকে ১২৭ গুণ বেড়ে প্রায় ১০ হাজার ৯৫৪ জিবিপিএসে দাঁড়িয়েছে এবং গ্রাহক প্রতি মোবাইল ডাটা ব্যবহারের পরিমাণ ১০০ এমবি থেকে ৮০ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ জিবিতে।
প্রবন্ধে আরো দেখানো হয়, সংযোগ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় সাফল্য এলেও বাংলাদেশ এখনো মূলত একটি ‘ডিজিটাল কনজাম্পশন বা প্রযুক্তি ব্যবহারের বাজার’ হিসেবেই রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের মতো উচ্চ-মূল্যের প্রযুক্তি উদ্ভাবন বা সেবা রপ্তানি হাব হিসেবে পুরোপুরি আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে টেলিকম খাতের অবদান ৮ শতাংশ থেকে আরো বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব, যদি সঠিক নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা ছিল ১৪ হাজার ৮৩৩ জিবিপিএস, যার ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ৫জি প্রযুক্তির প্রসারের কারণে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই চাহিদা ১২০ টিবিপিএস ( টেরাবিটস পার সেকেন্ড) ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই বিশাল চাহিদা পূরণে সাবমেরিন কেবল সি-মি-উই-৬ (যা ২০২৬ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা) এবং বেসরকারি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও ফাইবারের বিস্তৃতি এবং ডেটা সেন্টারের আধুনিকায়নে একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমানে জাতিসংঘের ‘টেলিকমিউনিকেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনডেক্স ২০২৪’ অনুযায়ী ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম, যা পরিকাঠামো উন্নয়নের বড় প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।
সাহেদ আলম বলেন, টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ৫ জিবি ডাটার খরচ মাথাপিছু জাতীয় আয়ের মাত্র শূণ্য দশমিক ৮৩ শতাংশ, যা বৈশ্বিক সাশ্রয়িতার সূচকে মোবাইল ব্রডব্যান্ডে বাংলাদেশকে ৬ষ্ঠ এবং ফিক্সড ব্রডব্যান্ডে ৩য় স্থানে রেখেছে। বাংলাদেশে প্রতি গিগাবাইট (জিবি) ডাটার গড় দাম মাত্র ৭ সেন্ট (প্রায় ৯ টাকা), যা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের (১২ সেন্ট বা ১৪.৭ টাকা) চেয়েও কম।
তবে এই সাশ্রয়ী মূল্যের বিপরীতে ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের মান এবং স্মার্টফোনের পেনিট্রেশন (যা বর্তমানে প্রায় ৫৬ শতাংশ) বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সঙ্গে ইন্টারনেটের ট্রাফিক জেনারেশনে মেটা (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ) এবং আমাজনের মতো গ্লোবাল ডিজিটাল জায়ান্টদের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মোট মোবাইল ও ফিক্সড ইন্টারনেট ট্রাফিকের একটি বড় অংশই এই প্ল্যাটফর্মগুলো দখল করে রাখছে বলেও জানান সাহেদ আলম। এমন অবস্থায় নীতি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমেই কেবল টেলিকম খাতকে বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলেও উপস্থাপন করেন তিনি।
টিআরএনবির সভাপতিত্বে সমীর কুমার দে’র সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন টিআরএনবির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফআইসিসিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল কবীর প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
নুরুল কবীর বলেন, ভর্তুকি ও বাড়তি সুবিধা পেয়েও টেলিটকের অগ্রগতি নেই। ভর্তুকি, বাড়তি স্পেকট্রাম ও নানা ধরনের নীতিগত সুবিধা পাওয়ার পরও রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটক প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। তিনি বলেন, টেলিটক কেন শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও গ্রাহকভিত্তি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলো, সেটির কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি সক্ষম করতে বিদেশি বিনিয়োগ ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, সবার জন্য দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির সংযোগ পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে। সরকার স্মার্ট কানেক্টিভিটি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে এবং সার্ভার ও ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। একই সঙ্গে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলের আওতায় টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী আরো জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড বিক্রি করার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। বরং পুনঃবিনিয়োগের কথা ভাবছে সরকার। এজন্য দেশি বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা হবে। এআই এবং ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকে বড় পরিমাণে আয় করার সুযোগ রয়েছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রত্যেকটি উপজেলায় সরকার এআই ট্রেনিং সেন্টার করতে চায়; যেখান থেকে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে স্মার্টফোনকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন রেহান আসিফ আসাদ। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য স্পেকট্রামের মাধ্যমে রাজস্ব কমানো নয়, বরং একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা।
তিনি জানান, দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশলে ডেটা সেন্টার, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সাইবার নিরাপত্তা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দেশের উন্নয়নে বড় সুযোগ তৈরি করবে। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সঠিক নীতি, আধুনিক অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
টেলিকম খাত থেকে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের অবদান রাখার সম্ভাবনা রয়েছে এই খাত থেকে জিডিপির ১৫ শতাংশ অবদান আসা সম্ভব বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বিশ্বের শীর্ষ ২০ এর মধ্যে অবস্থান নিশ্চিত করতে চায় এবং সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে টেলিকম খাতের জন্য একটি পাঁচ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। বাজেটের পর রোডম্যাপ দেয়া হবে; এই রোডম্যাপ হবে সম্পূর্ণ পূর্বানুমেয়, ফলে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা থাকবে না।
উপদেষ্টা বলেন, গত ছয় সপ্তাহে টেলিকম খাত সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হয়েছে। এসব বৈঠকে তাদের চাহিদা, সমস্যা ও প্রত্যাশা শোনা হয়েছে। এই খাতে করহার তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও দেশের সামগ্রিক ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত এখনো কম। টেলিকম খাত বর্তমানে সরকারের দ্বিতীয় বৃহত্তম কর রাজস্ব উৎস।
কর কমানো হলে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে বলেও জানান তিনি। তবে সব সমস্যার সমাধান এক বাজেটেই সম্ভব না হলেও সরকার বাস্তবভিত্তিক সমাধানের চেষ্টা করবে। গার্মেন্টসে আমরা যেমন সুযোগ সুবিধা দিয়েছি; বাংলাদেশকে একটা হাব করতে আমরা ইলেকট্রনিকস খাতেও তেমন সুযোগ সুবিধা দেবো।