শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এ দুই খাতে জোর দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার একটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে সরকার। যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো, জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়ন, প্রশাসনিক আধুনিকীকরণ নিশ্চিত করা এবং সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে এডিপি প্রণয়ন করা হয়েছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলন কক্ষে সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এই এডিপি অনুমোদন দেয়া হয়। এনইসির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভায় সভাপতিত্ব করেন। এডিপির এই বড় আকারের বাজেটের ব্যাখ্যায় ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বড় আকারের উন্নয়ন বাজেট অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান-কোনোটিই টেকসইভাবে অর্জন করা সম্ভব নয়। সে কারণেই সরকার উচ্চাকাক্সক্ষী উন্নয়ন বাজেট গ্রহণ করেছে।
তিন লাখ কোটি টাকার এই উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আর স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান বা করপোরেশনের প্রকল্প ধরে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
সভা শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, প্রস্তাবিত এডিপির মোট আকার ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে জিওবি বাংলাদেশের অর্থায়নে বা সরকারের অর্থায়নে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা হবে এবং প্রকল্প ঋণ অনুদান ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
নতুন এডিপিতে বরাদ্দের পরিমাণ ৫০ শতাংশ বাড়ানোর ব্যাখ্যায় অর্থমন্ত্রী বলেন, চলমান অর্থবছরের তুলনায় এটি বড় আকারের উন্নয়ন কর্মসূচি, যা সরকারের বিনিয়োগ ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোর ইঙ্গিত। অর্থাৎ আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার যে প্রস্তাবটি দেয়া হয়েছে, এটাতে আমরা ধরে নিয়েছি একটি নির্বাচিত সরকারের সক্ষমতা অনেক বেশি। এফিসিয়েন্সি অনেক বেশি থাকবে এবং এটার বাস্তবায়ন ক্ষমতাও বেশি হবে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি দেখা যায়; অনেক প্রকল্পের ঠিকাদার এবং প্রকল্প পরিচালককে না পাওয়ারও ঘটনা ঘটে। এ পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রকল্প কাটছাঁট করে ধীরে চলা নীতি বেছে নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সংশোধিত এডিপির আকার নির্ধারণে তা আরেক দফা কাটছাঁট হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত বছর জুনে যে বাজেট দিয়েছিল, তাতে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি নির্ধারণ করা হয়েছিল। জানুয়ারিতে এসে কাটছাঁটের পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়ায় ২ লাখ কোটি টাকায়। তাতে সবচেয়ে বড় কোপ পড়ে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ কমে ৭৩ শতাংশ; আর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় কমেছে ৫৫ শতাংশ।
বাজেট কি উচ্চাভিলাসী? : বিএনপির নির্বাচনি ইশহারেও সামাজিক সুরক্ষা খাতসহ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি ছিল। তারই ধারাবাহিকতা দেখা গেল প্রথম বাজেটে এডিপি বরাদ্দের ছকে। তিন লাখ কোটি টাকার এডিপিতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে। এ খাতে মোট বরাদ্দ ৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। এরপরই রয়েছে শিক্ষা খাত।
সেখানে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। স্বাস্থ্যে ৩৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোটে বরাদ্দের ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা বাবদ থোক ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, কৃষক কার্ড বাস্তবায়নে ১ হাজার ৪০০ কোটি এবং মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ের কর্মরতদের সম্মানী বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে ররাদ্দ আন্তর্জাতিক মানদ-ের অনেক কম বরাদ্দ এবং অর্থ খচরের সক্ষমতার ঘাটতি ও দুর্নীতি নিয়ে বরাবরই সমালোচনা হয়ে আসছে। এরকম বাস্তবতায় বাড়তি বরাদ্দ বাস্তবায়ন হবে কিনা এবং অর্থনীতির নানামুখি সংকটের মধ্যে ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে এডিপির আকার নির্ধারণ উচ্চাভিলাষী কিনা-সেই প্রশ্নে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অবশ্যই। এইখানে আমরা কিন্তু সব কথাগুলো স্পষ্টভাবে বলেছি।
স্বাস্থ্য, শিক্ষাক্ষাত, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এবং এই যুব সমাজের উন্নয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এগুলো কিন্তু সবকিছু এক জায়গায়। এবং এই জায়গায় বাজেট না দিলে আমরা ইউনিভার্সেল হেলথ কেয়ারের যে কথাটা বলছি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, এটার সঙ্গে আরো অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা, এগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলেতো আপনাকে বাজেট দিতে হবে, তাই না? তিনি বলেন, শিক্ষার বেলাতেও তাই। শিক্ষার কিন্তু আমরা বিস্তৃতিটা বাড়াচ্ছি, এখানে কিন্তু প্রচুর স্কিল ডেভেলপমেন্ট হবে। আপনার দক্ষতা বাড়ানো। এখানে প্রচুর ইনস্টিটিউশন হবে।
কারিগরি শিক্ষা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিয়ে যাওয়ার আশার কথা শুনিয়ে মন্ত্রী বলেন, এতে দেশের ভিতরে ডিমান্ড মিট করবে, দেশের বাইরে তারা ডিমান্ড মিট করবে। এইখানে তো বিনিয়োগ করতে হবে। এবং কোন খাতে কত বিনিয়োগ করব, এটার রিটার্ন কী, এখান থেকে কত কর্মসংস্থান হবে, এগুলো তো আমরা হিসাব করেছি। হিসাব করে বিনিয়োগ করতে হবে। তিনি বলেন, এখন বাস্তবায়ন হবে কি না-এটা তো অপেক্ষা করতে হবে।
বাস্তবায়ন হবে কি না-বাস্তবায়ন তো করতে হবে। বাস্তবায়ন না হলে আমরা আমাদের গ্রোথ অ্যাচিভ করব কীভাবে? আমরা কর্মসংস্থান অ্যাচিভ করব কীভাবে? আমার রপ্তানি বাড়বে কীভাবে? আমাদের শিল্পের প্রোডাকশন বাড়বে কীভাবে? এগুলো তো সবকিছু একটার সঙ্গে একটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটা আমাদের করতে হবে সো ফার।
অর্থমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের জন্য উচ্চাকাক্সক্ষা প্রয়োজন। ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে বড় বিনিয়োগ দরকার। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, টিউবওয়েলের পানি কমে গেলে যেমন পানি ঢেলে চাপ বাড়াতে হয়, তেমনই অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বড় আকারের বিনিয়োগ অপরিহার্য। তিনি বলেন, সরকারের দৃঢ় নেতৃত্ব, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
এডিপি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে নির্দিষ্ট মানদ- নির্ধারণ করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ না হলে দায় নির্ধারণ করা হবে এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে।
বর্তমানে সরকারের অধীনে থাকা প্রায় এক হাজার ৩০০ প্রকল্প পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয়, অকার্যকর কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকল্প বাতিল করা হবে। আংশিক বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা বিবেচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। নতুন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হবে, সময় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত থাকবে।
রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো তুলনামূলকভাবে কম। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কারের মাধ্যমে কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করে রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি তার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।