নতুন অর্থবছরের বাজেট নিয়ে এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, পরিকল্পনাবিদ, দাতাগোষ্ঠী, উন্নয়ন সংস্থা, গ্লোবাল এডুকেশন ফান্ড, ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে আলোচনার কাজটি শুরু হয়েছে। কোন খাত কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে তা নিয়েও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বক্তব্য দিচ্ছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কতটা কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তো থেকেই যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে মূলত মানবসম্পদের গুণগত মানের ওপর। বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় শুধু শ্রমনির্ভর প্রবৃদ্ধি দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়; প্রয়োজন দক্ষ, প্রযুক্তি-সক্ষম এবং উদ্ভাবনী মানবসম্পদ। এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাবি।
সম্প্রতি শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানানো হয় জাতীয় সংসদ অধিবেশনেও। গত ৩০ এপ্রিল প্রথম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আসন্ন বাজেটে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানান।
আসন্ন বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ যে বাড়ছে তা খোদ প্রধানমন্ত্রীই বলেছেন। সংসদে শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জিডিপির বড় অংশ শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হবে। আমরা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের সম্মানী বাড়ানোর চেষ্টা করছি, যাতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে তারা মনোযোগ দিতে পারেন।
বর্তমান বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেও শিক্ষা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। এ খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করা হবে বলেও অঙ্গীকার করে দলটি।
জানা যায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। শীর্ষ ১০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাজেট ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রস্তাবিত প্রাক্কলন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যে কয়েকটি খাতে বাজেট বাড়ানো হচ্ছে তার মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা খাত অন্যতম।
প্রস্তাবিত প্রাক্কলন অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে বড় পরিসরে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য চলতি বাজেটে ৪৭ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হলেও ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে তা বেড়ে ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকায় দাঁড়াচ্ছে। অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৩৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ার হার প্রায় ১৯ শতাংশ। উন্নয়ন বাজেটেও প্রাথমিক শিক্ষায় বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। এডিপিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ১১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে, যা প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। তবে বাজেট বাড়িয়েও যে এই খাতের দুরবস্থা থেকে উত্তোরণ হবে তা মনে করেন না বিশেষজ্ঞরা। কারণ বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নয়, প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতা।
গত কয়েক অর্থ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ গত এক দশকে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের অংশ কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ থেকে নেমে ১২ শতাংশের ঘরে। জিডিপির অংশ হিসেবেও ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৫৩ শতাংশে, যা আগে ছিলো প্রায় ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অথচ ইউনেস্কো সুপারিশ করে জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করার।
দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এখনো পর্যাপ্ত মাত্রার কাছেও নেই। তবে বরাদ্দ যা-ই থাকুক, পুরোটা খরচই হচ্ছে না। প্রতিবছরই শিক্ষা বাজেটের একটি অংশ ফেরত যাচ্ছে। গবেষণা বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজেট বাস্তবায়নে সক্ষমতার হার কমে প্রায় ৯৫ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৮৭ শতাংশে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। ইউনেস্কো এবং আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী শিক্ষা খাতে একটি দেশের জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ বা মোট বাজেটের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। অথচ এ দেশের শিক্ষা বাজেট জিডিপির দুই শতাংশও পার হয়নি। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর এ উদ্যোগটি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কাক্সিক্ষত ফল আসবে না; কার্যকর বাস্তবায়ন ও শক্তিশালী তদারকি নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরো বলেন, বরাদ্দের অর্থ যাতে অপচয় বা দুর্নীতির মাধ্যমে নষ্ট না হয় এবং যথাযথ খাতে সঠিকভাবে পৌঁছে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দেশের সব অঞ্চলের বাস্তবতা এক নয়। বর্তমানে শিক্ষার মান নিয়ে সর্বত্রই বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। এ অবস্থায় শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হলে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা শিক্ষক প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়; শ্রেণিকক্ষের ভেতরে পঠনপাঠনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। তবে শিক্ষা খাতের বাজেটকে কেবল বরাদ্দ হিসেবে না দেখে বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, শিক্ষা খাতে আগামীতে বাজেট আরো বাড়ানো হবে, তবে সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হবে তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকার ঠিক করা জরুরি। কারিগরি শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং এটিকে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই এই খাতকে অবহেলা করা যাবে না।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজও সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ার বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাজেট ফেরত, অপচয় ও দুর্নীতি এ তিনটিকেই শক্তভাবে মনিটরিং করে ধীরে ধীরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে শিক্ষার বাজেট। সামনে গিয়ে অনেক প্রোজেক্ট হয়তো আমরা বন্ধ করে দেবো। অনেক প্রজেক্টের ছড়াছড়ি, সবগুলো প্রজেক্ট হয়তো আমরা একই ছাতার নিচে নিয়ে আসবো। জবাবদিহিতা আমরা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। সবার যেন দায়বদ্ধতা থাকে কাজে। সেক্ষেত্রে দুর্নীতি কমাবো।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ শুধু একটি উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্ত নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশলগত বিনিয়োগ। অবকাঠামো নির্মাণ দৃশ্যমান উন্নয়ন এনে দেয়, কিন্তু মানবসম্পদ উন্নয়ন একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি শক্তি তৈরি করে। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ এখন বাংলাদেশের জন্য অনেকটা যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্রে বিনিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ। অস্ত্র ছাড়া যেমন যুদ্ধে জেতা সম্ভব নয়, শিক্ষায় সঠিক বিনিয়োগ ছাড়া দেশের উন্নতি সম্ভব নয়।
বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও দেখা গেছে, শিক্ষায় অতিরিক্ত বিনিয়োগ একটি দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়ে, দারিদ্র্য কমে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন দক্ষ ও শিক্ষিত নাগরিক শুধু নিজের আয়ই বাড়ান না; তিনি রাষ্ট্রের করভিত্তি সম্প্রসারণ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং উদ্ভাবনী অর্থনীতি গঠনে অবদান রাখেন।