২০২৪ সালের আগস্টে এক শিশুর প্রায় কাঁধ পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে থাকার সাদা-কালো একটি ছবিতে তোলপাড় হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বন্যায় মানুষের মানবেতর জীবনযাপনের এমন সময়ে ভীত শিশুর ওই ছবি মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছিল।
আবার অনেকেই ফেসবুকে শিশুটির পরিচয় ও সন্ধান জানতে চায়। কিন্তু পরে দেখা গেল সাড়া জাগানো ওই ছবিটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এ আই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা। ফলে আমরা কিভাবে জীবন-যাপন করি, তা নাটকীয়ভাবে পাল্টে দেয়ার দারুণ ক্ষমতা আছে এ আই এর- সেটি ভালো বা মন্দ উভয় অর্থেই হতে পারে।
শুধু বাংলাদেশই নয় বরং বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এআই প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যবহার ও অপব্যবহার দুই বাড়ছে। বিশ্বের অনেক দেশেই এই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে বিভিন্ন আইনি কাঠামো রয়েছে। দেশগুলোর পূর্ণাঙ্গ আইন, এক্সিকিউটিভ আদেশ, নীতিমালা, পলিসি বা স্ট্র্যাটেজি, বিল এমন নানা ধরনের আইনি পরিকাঠামো রয়েছে। ফলে সেসব দেশে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কোনো ছবি, ভিডিও বা কনটেন্ট তৈরির সীমা যেমন রয়েছে তেমনি অপব্যবহার রোধের ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে বাংলাদেশে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের সীমা বা অপব্যবহার রোধে এখনো আইনি কোনো কাঠামো নেই। অর্থাৎ কোনো সমন্বিত গাইডলাইন বা বিধিমালা, পলিসি বা নীতিমালা এমনকি স্ট্র্যাটেজিও নেই বাংলাদেশে। ফলে এআই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
২০১৯ সালে ওপেন এআই নামের একটি গবেষণা দল এমন একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছিল, যেটি মাত্র প্যারাগ্রাফের একটি অর্থবহ টেক্সট লিখতে পারতো। তিন বছর পর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে। চ্যাটবট-জিপিটি ব্যবহার করে হাজার হাজার সংবাদ প্রতিবেদন এবং সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট লেখা হচ্ছে এখন।
জেনারেটিভ এআই আসার পর যে কারো কণ্ঠ, চেহারা নকল করা হচ্ছে। যা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্টিফেন হকিং থেকে শুরু করে ইলন মাস্ক- বিশ্বের শীর্ষ কয়েকজন বিজ্ঞানী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, এটি একসময় হয়তো মানব প্রজাতির জন্য একটি হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই পদ্ধতি যতই শক্তিশালী হয়ে উঠবে, ততই এটি অতি বুদ্ধির অধিকারী হয়ে উঠবে। এটি হয়তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষের সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যাবে। এটি এতো চালাক যে মানুষের বুদ্ধিকেও সে পরাস্ত করতে পারে। মানুষের গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করা হতে পারে- নিরাপত্তার ব্যাপারে সব ধরনের ঝুঁকিই এখানে আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে শুধু ভালো প্রয়োগ নেই, এটিকে খারাপ কাজেও প্রয়োগ করা হতে পারে, সে বিষয়ে সতর্ক হওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন জীবনকে সহজ করে, তেমনি এর অপব্যবহারে দুর্বিষহও হয়ে ওঠে। আইনজীবীরা মনে করেন, এ আই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য আইনি কাঠামো থাকা উচিত। প্রযুক্তি কতটুকু ব্যবহার করা যাবে আর কতটুকু যাবে না, সেটির সীমা নির্ধারিত থাকতে হবে। কারণ এটি এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, ব্যাংকিং, শিল্প উৎপাদন ও গণমাধ্যম—প্রায় সব খাতেই এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে দ্রুত।
এআই এর মতো উন্নত প্রযুক্তি মানবসভ্যতার জন্য অভাবনীয় সম্ভাবনা নিয়ে এলেও, বর্তমানে এগুলোকে মানব অস্তিত্বের জন্য একটি বড় ধরণের হুমকি হিসেবেও গণ্য করা হচ্ছে। তাহলে আমরা কি এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করব, যা আমাদের ছাড়িয়ে যাবে বা আমাদের চেয়েও উন্নত হবে? আমরা কি আমাদের সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি নেব?