১৯৭১ সালের ঈদুল ফিতর ছিল বাঙালির ইতিহাসে এক গভীর বেদনা আর নিরানন্দে ভরা অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক বাশার খান তার লেখায় উল্লেখ করেছেন—এমন বিষণ্ন ও শোকাবহ ঈদ আর কখনো দেখেনি এ জাতি।
সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর টানা হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন ও দমন-পীড়নে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ দিন কাটাচ্ছিল ভয়, অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কে। ঠিক সেই অবস্থাতেই পঞ্জিকার নিয়মে ঈদ এলেও উৎসবের কোনো আবহ ছিল না। বরং যুদ্ধরত দেশজুড়ে ছিল শোক, ক্ষুধা আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
ঈদের দিনে পাকিস্তানি সামরিক সরকার নিজেদের সেনা ও তাদের সহযোগী বাহিনী—রাজাকার, আলবদর ও আল শামস সদস্যদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দেয় এবং তাদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও করে।
কিন্তু অন্যদিকে, স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা মুক্তিযোদ্ধা, অবরুদ্ধ শহরের সাধারণ মানুষ কিংবা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া লাখো মানুষের কাছে ঈদ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা।
অবরুদ্ধ ঢাকায় ঈদের দিনও ছিল আতঙ্কময়। চারদিকে সেনাদের টহল, গুলির শব্দ আর অনিশ্চয়তায় মানুষ ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছিল। অনেকেই ঈদের নামাজে যেতে সাহস পাননি। কোনো আয়োজন ছিল না, ছিল না নতুন কাপড় বা আনন্দের ছোঁয়া।
লেখক জাহানারা ইমাম তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন—তাদের বাসায় ঈদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না, এমনকি সন্তানরাও নামাজে যায়নি। তবুও তিনি গোপনে কিছু খাবার রান্না করেছিলেন, যদি কোনো মুক্তিযোদ্ধা আশ্রয়ের জন্য আসে।
একই চিত্র ছিল দেশের বিভিন্ন জেলাতেও। যুদ্ধ, খাদ্যসংকট ও নিরাপত্তাহীনতায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ আরও কষ্টে দিন কাটাচ্ছিল। অনেক জায়গায় ঈদের নামাজ হলেও তা ছিল সীমিত এবং আতঙ্কের মধ্যেই। নামাজ শেষে মানুষ দ্রুত ঘরে ফিরে আসত, অনেক ক্ষেত্রে কোলাকুলিও হয়নি।
রণাঙ্গনে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ঈদ ছিল আরেক রকম। কোথাও কোথাও খুব সীমিত আয়োজন—সেমাই বা সামান্য খাবার। অনেকেই খেতে বসে পরে জানতে পেরেছেন সেদিন ঈদ। পরিবার থেকে দূরে, যুদ্ধের ময়দানে তারা কাটিয়েছেন আবেগময়, অশ্রুসিক্ত সময়।
অন্যদিকে, ভারতে আশ্রয় নেয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর জন্য ঈদ ছিল আরও কঠিন। খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকটে তারা ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছিলেন। নতুন পোশাক বা বিশেষ খাবারের প্রশ্নই ওঠেনি। শিশুদের মুখে আনন্দের বদলে ছিল হতাশা।
প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সদস্যরাও খুব সাধারণভাবে ঈদ পালন করেন। নামাজ আদায় হলেও বিশেষ কোনো আয়োজন ছিল না। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ নিজেও ঈদের দিন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সময় কাটান এবং নিজের জন্য আনা খাবার তাদের মাঝে বিলিয়ে দেন।
সব মিলিয়ে ১৯৭১ সালের ঈদ ছিল আনন্দহীন, সংগ্রামময় এবং ত্যাগের প্রতীক। এটি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং একটি জাতির মুক্তির লড়াইয়ের কঠিন বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে আছে ইতিহাসে।