বিশ্বজুড়ে যখন জ্বালানি তেলের দামে আগুন, তেলের সংকট যখন ক্রমেই গভীর হচ্ছে, ঠিক একই সময়ে সাগরের বুকে ভাসছে কোটি কোটি লিটার অপরিশোধিত তেল। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত, সরবরাহ সংকট এবং উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী; অন্যদিকে দুর্ঘটনা ও অব্যবস্থাপনায় এই মূল্যবান সম্পদ অপচয় হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে।
সম্প্রতি একাধিক তেলবাহী জাহাজ দুর্ঘটনার ফলে সমুদ্রজলে ছড়িয়ে পড়েছে বিপুল পরিমাণ তেল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু একটি বড় তেল ট্যাঙ্কার দুর্ঘটনাতেই কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি লিটার তেল সাগরে মিশে যেতে পারে। এই তেল আর পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, ফলে তা সরাসরি পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক সংঘাতের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন তেল স্থাপনা ও জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পারস্য উপসাগর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিপুল পরিমাণ তেলের আস্তরণ। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, মহাকাশ থেকে ধারণ করা স্যাটেলাইট ছবিতেও তা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালীসংলগ্ন কেশম দ্বীপ এলাকার পাঁচ মাইলেরও বেশি জুড়ে তেলের স্তর ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, লাভান দ্বীপসংলগ্ন এলাকাতেও বড় আকারের তেলের আস্তরণ শনাক্ত হয়েছে। লাভান দ্বীপের অন্তত পাঁচটি স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়া তেল এখন পার্শ্ববর্তী শিদভার দ্বীপে পৌঁছাচ্ছে। প্রবালসমৃদ্ধ এই দ্বীপটি কচ্ছপ, সামুদ্রিক পাখি ও বিলুপ্তপ্রায় নানা প্রজাতির প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
ফলে এই তেলের কারণে শুধু অবকাঠামোগত ক্ষতিই নয়, পারস্য উপসাগরের নাজুক জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা গেলে এটি একটি বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় অর্থনীতি এবং পানীয় জলের নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
পাশাপাশি অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলে মাছ ধরা এবং উপকূলীয় জীবিকার ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টগুলোও ঝুঁকিতে পড়বে, যেগুলোর ওপর কোটি মানুষের পানীয় জলের সরবরাহ নির্ভরশীল।
গ্রিনপিস জার্মানির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পারস্য উপসাগরে প্রায় ৭৫টি বড় তেলবাহী ট্যাংকার অবস্থান করছে, যেগুলোতে প্রায় ১৯ বিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত তেল রয়েছে। আরও জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও তেল দূষণ একসঙ্গে মিলে এখন একটি দ্বৈত সংকট তৈরি করেছে, যা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।