ইসরায়েল আর যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ছিল খাতা-কলমে নিখুঁত। লক্ষ্য ছিল একটাই—তেহরানের শাসনব্যবস্থায় ধস নামিয়ে দেওয়া। কিন্তু যুদ্ধের ময়দান যখন তপ্ত হয়ে উঠল, তখন দেখা গেল এক ভিন্ন বাস্তবতা।
যে ‘শক অ্যান্ড অউ’ বা আকস্মিক আঘাতে ইরানকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন তারা দেখেছিল, তা এখন কেবলই দুঃস্বপ্ন! চার দিন পার হতে না হতেই যুদ্ধের মানচিত্র বদলে গেছে।
যে জনরোষের আশায় ওয়াশিংটন বসে ছিল, তার বদলে দেখা যাচ্ছে ইরানি প্রশাসনের ইস্পাতকঠিন স্থিতিশীলতা। ভেঙে পড়া তো দূরের কথা, ইরান এখন পাল্টা আঘাতে শত্রুপক্ষকে দিশেহারা করে দিচ্ছে।
ইরান প্রমাণ করে দিয়েছে, এটি ইরাক কিংবা আফগানিস্তান নয়। তেহরানের রণকৌশল কেবল জেদ নয়, বরং এক সুচিন্তিত মরণকামড়। আয়াতুল্লাহ খামেনির বিদায়ের পর যারা ভেবেছিল তেহরান আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করবে, তাদের মুখে ছাই দিয়ে ইরান এখন আরও অনমনীয়।
আরো পড়ুন: ইরান যুদ্ধে যে কারণে বিভক্ত ইউরোপ
আঞ্চলিক দেশগুলোকে দেওয়া ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি এখন বালির বাঁধের মতো ধসে পড়ছে। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে—হয় কাঠামোগত পরিবর্তন হবে, নয়তো এই যুদ্ধ হবে অন্তহীন। ইরানের কৌশল এখন আর কেবল রক্ষা নয়, বরং শত্রুকে ক্লান্ত করে দেওয়ার এক দীর্ঘমেয়াদি খেলা।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ জেনারেল ড্যান কেইন যখন বলেন ‘অতিরিক্ত প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে’, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে ওয়াশিংটন আসলে কতটা চাপে আছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যতই সান্ত্বনা দিন না কেন, ‘এটি অন্তহীন যুদ্ধ নয়’—বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
মার্কিন প্রশাসন এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে, এই লড়াই তাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি প্রাণঘাতী হতে যাচ্ছে। নেতানিয়াহুর গলার জোরও এখন অনেক নিচু।
ইরানের আইআরজিসি-র এক সামরিক কর্মকর্তা যখন বলেন, ‘আমরা নেতাকে হারিয়েছি কিন্তু আমেরিকা হারাবে তার অস্তিত্বের ভিত্তি’—তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়, পাল্লাটা এখন কার দিকে ভারী।
আরো পড়ুন: হাইপারসনিক মিসাইল যে কারণে ভয়ঙ্কর
ইরানের আসল তুরুপের তাস হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একটি ছোট পদক্ষেপেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী। সৌদি আরবের শোধনাগার আর কাতারের এলএনজি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিশাল ধস।
তেহরান জানে কোথায় আঘাত করলে ওয়াশিংটনের মেরুদণ্ড কেঁপে ওঠে। তারা সামরিক শক্তির চেয়েও বেশি ব্যবহার করছে ‘কস্ট-ডিস্ট্রিবিউশন’ কৌশল, যেখানে প্রতিটি মার্কিন পদক্ষেপের জন্য গুণতে হচ্ছে শতগুণ চড়া দাম।
শেষ পর্যন্ত এই লড়াই অস্ত্রের নয়, বরং সহ্যের। ইরান দেখিয়ে দিয়েছে তাদের মজুত অটুট, পরিকল্পনা নিখুঁত। আর আমেরিকা? তারা এখন ব্যস্ত পরাজয়ের গ্লানি ঢাকা দিতে।
এই সংঘাত কেবল ইরানকে নয়, বরং চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতাকেও বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে এখন কেবলই পরাজয়ের বালুচর দেখছে পশ্চিমারা। আর তেহরান দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন বিজয়ী শক্তি হিসেবে।