ক্লান্ত মুখ, ফোলা চোখ আর অনিশ্চয়তার ভারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের দৃশ্য এখন ঢাকার পেট্রোল পাম্পগুলোতে নিয়মিত। জ্বালানি তেল পাওয়া যাবে কি না—এই অনিশ্চয়তা নিয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি রাতভর অপেক্ষা করছেন সাধারণ মানুষ। মোটরসাইকেল যাদের একমাত্র ভরসা, তাদের কাছে এখন সেই বাহনটিই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাদরাসায় শিক্ষকতা ও ইমামতির পাশাপাশি জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ছুটতে হয় মিজানুর রহমানকে। তিনদিন ধরে তেলের জন্য অপেক্ষা করেও না পেয়ে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে তার মোটরসাইকেল। একই অবস্থা রতন সরকারের। ছোটাছুটির কাজে মোটরসাইকেল নিয়ে ভোর ৫টার পরও কুড়িলের পিনাক্যাল পাম্পে এসে দেখেন—সামনে আরও শতাধিক বাইকের লাইন।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। কোনো পাম্পের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি, কেউ রাত ১০টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, কেউ ভোর থেকে। পাম্প কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময় বেঁধে দেয়ায় অনেকে যানবাহনে বসেই অপেক্ষা করছেন।
সকাল ১০টায় পিনাক্যাল পাম্পে এসে নিজের মোটরসাইকেল খুঁজতে গিয়ে হতাশ হন মিজানুর রহমান। লাইনের বাইরে সরিয়ে রাখা হয়েছে তার বাইক। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনটি পাম্প ঘুরেও তেল না পেয়ে কুড়িলের এই পাম্পে লাইনে দাঁড়ান।
রাত ১১টা পর্যন্ত না পেয়ে বাইক রেখে বাসায় ফিরে যান। শুক্রবার সকালে তেল দেওয়ার আশ্বাস পেলেও শনিবার এসে জানতে পারেন—তেল দেয়া হবে না। মাইকে ঘোষণা দেয়া হয়। আবার শুনছেন, বিকেল ৩টা থেকে তেল দেয়া হতে পারে।
মিজানুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, “আগে লাইন ধরে তেল পেতাম। এখন দিনের পর দিন বা রাতভর অপেক্ষা করেও তেল মেলে না। এই ভোগান্তির কথা আমরা কাকে বলব? কারণ আমাদের কথা শোনার মতো কেউ নেই।”
চালকদের অভিযোগ, জ্বালানি সরবরাহে অসাম্য রয়েছে। পাম্প থেকে আড়ালে তেল বের করে কালোবাজারে ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নিম্নআয়ের মানুষের পক্ষে এত দামে কেনা সম্ভব নয়, তাই লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। অনেকে বলছেন, বড় লোকদের লাইনে দাঁড়াতে হয় না; তারা বাসায় বসেই তেল পান।
রাইড শেয়ারিং করে বাড়তি আয় করেন মো. হাসান আলী। তিনি বলেন, “এটা আমার জরুরি বাহন। তেলের জন্য যদি পুরো দিন নষ্ট হয়, তাহলে আয়-রোজগার করব কীভাবে? এতে অর্থনৈতিকভাবে বড় ক্ষতি হচ্ছে। নিম্নআয়ের মানুষদের এই ভোগান্তি কমাতে সরকারের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত।”
পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানান, তেলের সংকটের কারণে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কোনো পাম্পে সকাল থেকে বিকেল, আবার কোথাও বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত তেল বিক্রি হয়। ফুরিয়ে গেলে পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
পিনাক্যাল পাওয়ার লিমিটেডের ম্যানেজার সৈয়দ নুরুল হাসান বলেন, আমাদের পাম্পে প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার লিটার জ্বালানি আসে, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। আগে অতিরিক্ত গাড়ি এনে সরবরাহ বাড়ানো হতো, এখন তা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি জানান, বর্তমানে বিকেল ৩টা-৪টার দিকে তেল বিক্রি শুরু হয়ে রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত চলে। দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার লিটার। সরকারের বক্তব্য ও বাস্তবতার মিল নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীরা একটি চক্র তৈরি করেছে বলে শোনা যাচ্ছে।
নুরুল হাসান আরও বলেন, পাম্পে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কেউ জোর করে লাইনে বাইক রেখে দিচ্ছে, আবার কেউ একাধিকবার তেল নিয়ে বাইরে মজুত করছে। অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা হলেও তেমন কাজ হচ্ছে না।
জ্বালানি সংকটে রাজধানীর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন যেন থমকে গেছে। এই ভোগান্তি কবে কমবে—তা এখন অনেকেরই প্রশ্ন।