ইনকিলাব মঞ্চে হঠাৎ এ কীসের ঝড়? কিন্তু কী এমন ঘটলো, যার কারণে এক রাতে একসাথে পদত্যাগ করলেন বিপ্লবের অন্যতম চেনা মুখ আবদুল্লাহ আল জাবের ও সহ-সভাপতি জুমাসহ ৬ জন শীর্ষ সেনানী? এমন নাটকীয় সরে দাঁড়ানোর পেছনে আসলে কী ঘটছে? এটি কি কেবলই একটি সাধারণ পদত্যাগ, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর রহস্য আর অভ্যন্তরীণ চরম দ্বন্দ্ব?
পেছনে ফিরে যাওয়া যাক ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে। ফ্যাসিবাদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে যে তরুণেরা রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন, তাদের অগ্রভাগে ছিলেন এক লড়াকু প্রাণ—শরীফ ওসমান বিন হাদি! জুলাই আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও জুলাই-পরবর্তী সময়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তরুণদের দেখিয়েছিল নতুন পথ। কিন্তু… লড়াইয়ের সেই স্পর্ধিত নায়ক, সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে নিহত হন! তিনি চলে গেলেও রেখে যান তার স্বপ্নের মশাল—’ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো এক সাংস্কৃতিক দুর্গ! কিন্তু হাদির মৃত্যুর পরই কি শুরু হলো ভাঙনের খেলা?
এই ইনকিলাবকে গড়ে তুলতে দিন-রাত এক করেছিলেন আরেক লড়াকু মুখ—ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা! জুলাই-পরবর্তী সময়ে লোভনীয় সব রাজনৈতিক প্রস্তাব হেলায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি। বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কেবল ‘বাংলাদেশপন্থি সংস্কৃতির’ স্বার্থে। জুমা বারবার সতর্ক করেছিলেন, ইনকিলাব যেন তার সাংস্কৃতিক ফোকাস হারিয়ে নোংরা রাজনৈতিক আবর্তে না জড়ায়। কিন্তু লড়াই যখন এক চরম স্পর্শকাতর মোড়ে এসে দাঁড়াল, তখনই শুরু হলো অপপ্রচার আর মানহানিকর মন্তব্যের নোংরা খেলা। জুমা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন—”বাবা-মার টাকায় বেঁচে থেকে এই নোংরা অপবাদের বোঝা আমি বইতে পারব না।” কিন্তু কী সেই অপবাদ? কী সেই জটিলতা?
রহস্য লুকিয়ে আছে শহীদ ওসমান হাদির অপ্রাতিষ্ঠানিক দলিলে! মৃত্যুর আগে হাদি চেয়েছিলেন একটি ট্রাস্ট গঠন করতে, কিন্তু তা সম্পন্ন করতে পারেননি। ফলে আইনি মারপ্যাঁচে ইনকিলাবের সব মালিকানা চলে যায় তার পরিবারের হাতে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো হয়ে যায় ফ্রিজ! বিগত ছয় মাস ধরে সমাধানের আপ্রাণ চেষ্টা করেও যখন আইনি ও পারিবারিক জটিলতা চূড়ান্ত রূপ নেয়, ঠিক তখনই জনতার আমানত হাদির পরিবারের হাতে তুলে দিয়ে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন জাবের-জুমা ও তাদের পুরো টিম। তবে তারা স্পষ্ট করেছেন—প্রতিটি কানাকড়ির হিসাব দ্রুতই জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে।
তবে ইনকিলাবের এই বড় ধাক্কায় যারা ওত পেতে থাকা শত্রু, তারা কি তবে জিতে গেল? এখানেই আবদুল্লাহ আল জাবের ছুড়ে দিয়েছেন এক বিস্ফোরক বোমা! মধ্যরাতে জাবেরের ফেসবুক ওয়ালে ভেসে ওঠে এক অগ্নিগর্ভ স্ট্যাটাস। তিনি সরাসরি হুঙ্কার দিয়ে লিখেছেন— “দিল্লির সেবাদাসদের খুশি হওয়ার কোনো কারণ নেই। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার ছেড়েছি, ইনকিলাব মঞ্চ নয়!” অর্থাৎ, জাবের স্পষ্ট করে দিলেন, তাদের দুর্গ ভেঙে পড়েনি। কালচারাল সেন্টারের লড়াই শেষ হলেও, ইনকিলাব মঞ্চের রাজপথের লড়াই এখনও বাকি! আজাদির এই সংগ্রামকে কোনোভাবেই থামানো যাবে না!
কিন্তু প্রশ্ন রয়েই যায়। এই ভাঙন কি ইনকিলাব মঞ্চকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেবে? নাকি জাবের-জুমার এই স্ট্র্যাটেজিক এক্সিট বড় কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস? আজাদির লড়াইয়ে এবার কোন রূপ ভাসবে বাংলাদেশের মাটিতে?
ইনকিলাব মঞ্চ: প্রতিষ্ঠা, লক্ষ্য, কার্যক্রম, দাবি ও বিতর্ক
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে আলোচিত সংগঠনগুলোর মধ্যে ইনকিলাব মঞ্চ একটি উল্লেখযোগ্য নাম। সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী, এটি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী এবং সেই আন্দোলনের আদর্শে অনুপ্রাণিত তরুণদের নিয়ে গঠিত একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস: ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শরীফ ওসমান বিন হাদি। সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি পরবর্তীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য হলো: সকল ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। ইনসাফ বা ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা।
২০২৫ সালের ঢাকসু নির্বাচন: ২০২৫ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ঢাকসু) নির্বাচনে ইনকিলাব মঞ্চের নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট প্যানেল থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন।
২০২৫ সালের জকসু নির্বাচন: একই বছরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচনেও ইনকিলাব মঞ্চের দুইজন নেতা ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত হন।
সংগঠনের প্রধান দাবি: ইনকিলাব মঞ্চের দাবি, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীকালে হত্যাকাণ্ড ও হামলার শিকার হন। এসব ঘটনার জন্য সংগঠনটি আওয়ামী লীগকে দায়ী করে এবং এগুলোকে “গুপ্তহত্যা” হিসেবে উল্লেখ করে।
এ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে তারা তিনটি প্রধান দাবি উত্থাপন করে— গণহত্যার অভিযোগে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন অবিলম্বে বাতিল করা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত যাদের তারা সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে, তাদের গ্রেফতার করা। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব “জুলাই-যোদ্ধার” জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ইনকিলাব মঞ্চের কার্যক্রম: প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আন্দোলনভিত্তিক কর্মসূচি পালন করে আসছে। উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে—দেশব্যাপী গ্রাফিতি ও স্লোগান পুনর্লিখন কর্মসূচি, শহীদি সপ্তাহ পালন, দাবি আদায়ে অনশন স্বাধীনতা সংগ্রামের আলোকচিত্র প্রদর্শনী, ভিডিও ডকুমেন্টেশন, শহীদি স্মৃতিকথা প্রকাশ, গণসেজদা কর্মসূচি, দ্রোহের গান পরিবেশনা।
বিতর্ক
২০২৬ সালের ১৩ মে ইনকিলাব মঞ্চ একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে। সেখানে সংগঠনটির সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের দাবি করেন যে, “ফিটনেস হারানোর ভয়ে ৫৫ শতাংশ মা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান না। এই বক্তব্যটি পরে বিভিন্ন গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের সমালোচনার মুখে পড়ে। সমালোচকদের মতে, উপস্থাপিত তথ্যটি নির্ভরযোগ্য গবেষণা দ্বারা সমর্থিত ছিল না এবং এটি বিভ্রান্তিকর তথ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।