২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চ দাম, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ এবং প্রযুক্তিপণ্যের ক্রমবর্ধমান খরচের মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা ভোক্তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি হলো কৃষি ও ভোগ্যপণ্যের ওপর কর কমানো। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, মাছ, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎসে কর কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই সঙ্গে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ ও চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রেও একই হার নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। সব ধরনের মসলার ওপর আরোপিত রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার এবং খেজুর আমদানির ক্ষেত্রে একই সুবিধা দেয়ার উদ্যোগ বাজারে এসব পণ্যের দাম কমাতে সহায়ক হতে পারে। শিশুখাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুবিধাগুলোর মধ্যে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর ভ্যাট ও অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করার প্রস্তাব করেছেন মন্ত্রী। ডায়ালাইসিস ব্লাড টিউবিং সেটের ওপর আরোপিত সাড়ে ৭ শতাংশ অগ্রিম করও তুলে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। হার্টের স্টেন্ট বা রিংয়ের সরবরাহ পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ক্ষেত্রেও ১০ শতাংশ ভ্যাট মওকুফ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য আমদানি করা ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করের হার ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
ওষুধ শিল্পের জন্যও বড় সুবিধা রাখা হয়েছে বাজেটে। ক্যানসারের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত নতুন ৯ ধরনের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক শূন্য করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ৫১টি এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) এবং ওষুধ শিল্পের আরো ১৭টি কাঁচামালের ওপর আরোপিত শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে ওষুধের দাম কমতে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, প্রিন্টার ও মনিটরের ওপর বিদ্যমান শুল্ক-ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া কম্পিউটার প্রিন্টার ও পোর্টেবল ডেটা প্রসেসিং মেশিনের ক্ষেত্রে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্থানীয় মোবাইল ফোন শিল্প উৎসাহ দিতে ২২ ধরনের কাঁচামালের ওপর অগ্রিম কর ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পয়েন্ট অব সেলস মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ পণ্যের অগ্রিম করও শূন্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহ দিতে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির মোট করভার ৯৩ শতাংশ থেকে ৬৪ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আমদানি করা ইলেকট্রিক বাসের ওপর সব ধরনের শুল্ক ও কর মওকুফ করা হয়েছে। ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের ক্ষেত্রেও সব শুল্ক-কর শূন্য করার প্রস্তাব রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সৌরবিদ্যুৎ শিল্পের বিভিন্ন উপকরণের ওপর সব ধরনের শুল্ক ও কর প্রত্যাহার অব্যাহত রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ বিল পরিশোধে ৫ শতাংশ কর রেয়াত এবং লিথিয়াম-আয়ন ও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের কাঁচামালের ওপর শুল্ক সম্পূর্ণ মওকুফ করা হচ্ছে।
কৃষি খাতে কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনের ৩৬টি কাঁচামালের ওপর ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হচ্ছে। জিংক সালফেট সার উৎপাদনের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক শূন্য করা হয়েছে। পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত নতুন তিন ধরনের কাঁচামালও শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।
সোনা ও সোনার গহনার ক্ষেত্রে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ এ খাতে করভার ৯০ শতাংশ কমছে, যা সোনার ব্যবসা ও বৈধ আমদানিকে উৎসাহিত করতে পারে।
সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী, সব ধরনের স্মার্ট কার্ড ও ডেবিট কার্ড উৎপাদনে ১০টি অত্যাবশ্যক কাচাঁমাল আমদানিতে ৫ শতাংশ অতিরিক্তি আমদানি শুল্ক অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে।
দেশীয় তেলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদন ব্যবসার করহার প্রথম পাঁচ বছরের জন্য সম্পূর্ণ অব্যাহতি এবং পরবর্তী তিন বছরের জন্য ৫০ শতাংশ ও তার পরের দুই বছরের ২৫ শতাংশ অব্যাহতি দিয়ে ১০ বছরের জন্য সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
রিসাইকেল্ড পণ্য ও রিসাইক্লিং কাঁচামালে করহার ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন মন্ত্রী। স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মরচুয়ারি সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
এছাড়া ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্কমুক্ত সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব এসেছে। নতুন মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
যেসব পণ্যের দাম বাড়বে
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় শিল্প সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক, ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়তে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর সবচেয়ে বড় ধরনের কর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সিগারেটের সব স্তরের ন্যূনতম খুচরা মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মোটরগাড়ি খাতেও করের চাপ বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। বিশেষ করে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার মধ্যম সারির ডিজেল ও পেট্রোলচালিত গাড়ির মোট করহার ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতে এ শ্রেণির গাড়ির দাম আরো বাড়তে পারে। আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্যের মধ্যে কাজুবাদামের ওপর বড় ধরনের শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের শুল্ক এক শতাংশ থেকে এবং প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। ফলে বাজারে আমদানিকৃত কাজুবাদামের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উচ্চমূল্যের আমদানিকৃত হিমায়িত মাছ এবং পাঙ্গাস মাছের ফিলেটের ওপরও নতুন কর আরোপ করা হয়েছে। হাই-ভ্যালু আমদানিকৃত মাছের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং পাঙ্গাস ফিলেটের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। এতে আমদানি করা মাছের খুচরা দাম বাড়তে পারে।
গৃহস্থালি পণ্যের মধ্যে আমদানি করা হাউজহোল্ড ওয়াশিং মেশিনের ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে বিদেশি ব্র্যান্ডের ওয়াশিং মেশিন কিনতে গ্রাহকদের বেশি অর্থ গুনতে হতে পারে। নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতের বিভিন্ন পণ্যেও কর বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এমএস রড ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে কর ও ভ্যাট প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এতে নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া আমদানি করা জিপসাম বোর্ড ও শিটের ওপর ২০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক, কোল্ড-রোল্ড কয়েল ও শিটের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক, কপার তারের ওপর ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক এবং কপার টিউবের শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব পণ্য নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট শিল্পের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে।
শিল্পের কাঁচামালের মধ্যে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবারে নতুন করে ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ, পিভিসি ও পিইটি রেজিনের শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ এবং মেইজ স্টার্চের শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাইসাইকেলের ফ্রি হুইলের শুল্কও ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে এক কেভিএ পর্যন্ত ক্ষমতার ট্রান্সফরমারের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। ফলে ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও বিতরণ খাতেও ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে।
গ্রিজ প্রুফ পেপার ও গøাসিন প্রুফ পেপারের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা ও একই সঙ্গে ৫টি কাচাঁমাল আমদানিতে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্কের প্রস্তাব করেছেন মন্ত্রী।
গ্রিজ প্রুফ পেপার এবং গ্লাসিন পেপার উভয়ই মূলত তেল ও চর্বি প্রতিরোধী কাগজ। গ্রিজ প্রুফ পেপার একটি ফুড-গ্রেড কাগজ, যা তৈলাক্ত বা আর্দ্র খাবার যেমন—বার্গার, স্যান্ডউইচ, পিজ্জা বা ভাজাপোড়া মোড়ানোর জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। গ্রিজ প্রুফ পেপার এবং গ্লাসিন পেপার যথাক্রমে সাধারণ ফাস্ট ফুড ও দৈনন্দিন খাবার মোড়ানোপ্রিমিয়াম ফুড প্যাকেজিং ও শৌখিন কাজে ব্যবহৃত হয়। এসব পণ্যের উপর করভার বাড়ানোর ফলে রেস্তোরায় খাবারের দাম বাড়বে।