বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদগুলোর একটি হলো জাতিসংঘের মহাসচিব। আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও উন্নয়ন কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন তিনি। তাই এই পদে কে আসীন হবেন, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচিত করা হয় কীভাবে?
প্রার্থী মনোনয়নের মাধ্যমে শুরু
মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রার্থী মনোনয়নের মধ্য দিয়ে। বিভিন্ন দেশ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে সামনে আনে। সাধারণত সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা অভিজ্ঞ কূটনীতিকরাই এই পদের জন্য বিবেচিত হন।
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিরাপত্তা পরিষদের
প্রার্থী মনোনয়নের পর বিষয়টি যায় United Nations Security Council-এর কাছে। ১৫ সদস্যের এই পরিষদ সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা ও অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটি করে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা। United States, China, Russia, United Kingdom এবং France—এই পাঁচ দেশের যেকোনো একটি কোনো প্রার্থীর বিরোধিতা করলে তার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়।
সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন
নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করার পর বিষয়টি যায় United Nations General Assembly-এর কাছে। ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের এই পরিষদ ভোটের মাধ্যমে প্রার্থীকে অনুমোদন দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হয়।
মহাসচিবের মেয়াদ কতদিন?
জাতিসংঘের মহাসচিবের মেয়াদ পাঁচ বছর। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী একজন মহাসচিব সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর এই পদে থাকতে পারেন।
একজন মহাসচিবের কী ধরনের যোগ্যতা থাকা দরকার?
যদিও জাতিসংঘ সনদে নির্দিষ্ট যোগ্যতার তালিকা নেই, তবুও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, কূটনৈতিক দক্ষতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে অভিজ্ঞতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের সমর্থন পাওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। ফলে এরই মধ্যে পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম নিয়ে কূটনৈতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে, যা আগামী মাসগুলোতে আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচন কেবল একটি প্রশাসনিক নিয়োগ নয়; বরং এটি বৈশ্বিক কূটনীতি, আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য এবং বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। তাই এই নির্বাচন সবসময়ই আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে থাকে।
আলোচনায় বাংলাদেশের ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এর নাম
জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে। এ উপলক্ষে সংস্থাটির পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আলোচনা জোরালো হচ্ছে।
ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় বিভিন্ন দেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের নাম আলোচনায় এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এর নামও অনানুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন মহলে উচ্চারিত হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, বর্তমান মহাসচিবের মেয়াদের শেষ বছরে সাধারণত উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়া গতি পায়। এ কারণে জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ অধিবেশনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের পথিকৃৎ, নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক ব্যবসা বিষয়ে দীর্ঘদিনের কাজের কারণে ড. ইউনূস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন। বৈশ্বিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানবকল্যাণে তার অবদানের কারণে তাকে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের একটি আলোচিত নাম হিসেবে দেখছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
তবে আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্নও সামনে আসছে। ২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার বান কি মুন এশিয়া অঞ্চল থেকে মহাসচিব ছিলেন। এরপর ২০১৭ সাল থেকে পর্তুগালের আন্তোনিও গুতেরেস ইউরোপীয় অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। জাতিসংঘের অলিখিত আঞ্চলিক রোটেশন নীতির আলোকে এবার আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকা অঞ্চল থেকে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যে বৈশ্বিক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। তবে এই পদের জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশের সমর্থন এবং কোনো ভেটো না থাকা বাধ্যতামূলক হওয়ায় ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমীকরণ ও পরাশক্তিগুলোর ঐকমত্যই চূড়ান্ত নির্ধারক হবে।