সমাজে প্রতিষ্ঠিত, উচ্চশিক্ষিত এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল সন্তান—সাধারণত এমন পরিবারের কথা উঠলে অনেকেই মনে করেন, সেখানে বাবা-মায়ের জীবন হবে নিরাপদ ও সম্মানজনক। কিন্তু বাস্তবতা কখনও কখনও এমন নির্মম চিত্র তুলে ধরে, যা পুরো সমাজকে নাড়া দেয়। তবে সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে নূরজাহান বেগমের মরদেহ দীর্ঘ সাত দিন পড়ে থাকার ঘটনা প্রকাশ্যের নানা প্রশ্ন উঠছে। সত্যি কি উচ্চশিক্ষা মানবতা নিশ্চিত করতে পারে?
জানা গেছে, হতভাগ্য সেই মায়ের সব সন্তানরাই উচ্চ শিক্ষিত এবং সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ওই মা একাকীত্ব, অবহেলা ও মানসিক কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন।
নূরজাহান বেগমের বড় ছেলে ড. এ কে এম আনিসুর রহমান বাংলাদেশ সরকারের একজন যুগ্মসচিব। বর্তমানে তিনি মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষে কর্মরত রয়েছেন। জানা গেছে, ড. আনিসুর রহমান শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তিনি ১৯৮৬ সালে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৮৮ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। উভয় পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম বিভাগ অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে প্রথম বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
সরকারি চাকরিজীবনে তিনি পরিকল্পনা কমিশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার কেডিআই স্কুল অব পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট থেকে এমপিপি ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ‘সরকারি কর্মচারী হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ’ প্রকল্পের উপ-পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
দ্বিতীয় ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান দেশের একজন খ্যাতিমান প্রকৌশলী ও শিক্ষক। তিনি বর্তমানে বুয়েটে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি তিনি প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি হিসেবেও যুক্ত আছেন।
ড. আশিকুর রহমান ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ৩২তম ব্যাচের প্রাক্তন ক্যাডেট। তিনি ১৯৮৯ সালে এসএসসি এবং ১৯৯১ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় স্থান অর্জন করেন। ১৯৯৮ সালে বুয়েট থেকে সিএসই বিষয়ে বিএসসি এবং ২০০১ সালে এমএসসি সম্পন্ন করার পর কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা থেকে কম্পিউটিং সায়েন্সে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
অন্যদিকে ছোট ছেলে কে এম আতিকুর রহমান বর্তমানে কানাডায় বসবাস করছেন। তার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। এছাড়া নূরজাহান বেগমের একমাত্র কন্যা ফাতিমা নাসরিন সুলতানা মিরপুরের ইম্পেরিয়াল স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। মেয়ের স্বামীও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, তিনি ৫ বছর আগে মারা গেছেন।
তবে এই ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো—শিক্ষা কি কেবল ডিগ্রি, চাকরি এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জনের মাধ্যম, নাকি এর সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধেরও সম্পর্ক রয়েছে? একটি সমাজ তখনই সুস্থ ও সুন্দর হয়ে ওঠে, যখন শিক্ষার সঙ্গে নৈতিকতা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধের সমন্বয় ঘটে। কেবল ভালো ফলাফল বা বড় চাকরি একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত করে তোলে না; বরং তার আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতা সেই শিক্ষার প্রকৃত পরিচয় বহন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক নগরজীবনে পারিবারিক বন্ধন অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। কর্মব্যস্ততা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন এবং বিদেশমুখী প্রবণতার কারণে অনেক বয়স্ক বাবা-মা একাকীত্বের মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। সন্তানরা হয়তো নিয়মিত অর্থ পাঠাচ্ছেন কিংবা প্রয়োজনীয় খরচ বহন করছেন, কিন্তু একজন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অর্থ নয়; প্রয়োজন সঙ্গ, খোঁজখবর এবং মানসিক সমর্থন।
মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বার্ধক্যে মানুষের শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি বেড়ে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠেন। তারা সন্তানের কণ্ঠ শুনতে চান, তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে চান, নিজের অনুভূতি ভাগাভাগি করতে চান। কিন্তু যখন সেই সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হন, তখন নিঃসঙ্গতা ধীরে ধীরে মানসিক কষ্টে পরিণত হয়।
বাংলাদেশে যৌথ পরিবারের সংস্কৃতি একসময় খুব শক্তিশালী ছিল। একই ছাদের নিচে দাদা-দাদি, বাবা-মা এবং সন্তানরা একসঙ্গে বসবাস করতেন। ফলে বয়স্কদের দেখভাল করা তুলনামূলক সহজ ছিল। কিন্তু নগরায়ণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে এখন অনেক পরিবার নিউক্লিয়ার বা একক পরিবারে রূপান্তরিত হয়েছে। এর ফলে বয়স্ক সদস্যদের অনেকেই একা হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তাদের নিঃসঙ্গতা আরও বেড়ে যায়।
নূরজাহান বেগমের ঘটনাটি সেই বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতারই একটি করুণ প্রতিচ্ছবি হতে পারে। যদিও এই ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি এবং পারিবারিক সম্পর্কের সব দিক জনসমক্ষে আসেনি, তবুও এটি আমাদের সমাজকে আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। একজন মা, যিনি সন্তানদের মানুষ করতে জীবনের সেরা সময়, শ্রম এবং ভালোবাসা উৎসর্গ করেছেন, তার শেষ জীবন কতটা নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ ছিল—সেটি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সব মূল্যবোধেই বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্মে মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে বারবার বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শুধু ধর্মীয় কারণেই নয়, মানবিক কারণেও বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন একটি নৈতিক কর্তব্য।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, প্রযুক্তি ও শিক্ষায় যতই উন্নতি হোক, যদি পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে সেই উন্নতির অর্থ কী? আবার কেউ কেউ মনে করেন, কোনো পরিবারের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা না জেনে একপাক্ষিক মন্তব্য করা উচিত নয়। তবে সবাই একমত যে, বয়স্কদের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা পরিবার এবং সমাজ—উভয়েরই দায়িত্ব।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে শুধু পরিবারের ওপর নির্ভর করলেই হবে না; রাষ্ট্র ও সমাজকেও আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। একাকী বসবাসকারী বয়স্কদের জন্য নিয়মিত খোঁজখবর, সামাজিক সহায়তা এবং জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রতিবেশীদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো দরকার, যাতে দীর্ঘ সময় কারও খোঁজ না পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত হচ্ছি, নাকি কেবল ডিগ্রিধারী হচ্ছি? শিক্ষা যদি মানুষকে আরও দায়িত্বশীল, মানবিক এবং সংবেদনশীল না করে, তবে সেই শিক্ষার পূর্ণতা কোথায়? একজন মানুষের সাফল্য তার পদবি, বেতন বা ডিগ্রির মাধ্যমে নয়, বরং তার মানবিক আচরণ এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেও মূল্যায়িত হয়।
এই ঘটনা হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদ শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাবে, কিন্তু এর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো সহজে মুছে যাবে না। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত নিজের পরিবার, বিশেষ করে বয়স্ক বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবা। কারণ জীবনের শেষ সময়ে একজন মা বা বাবার সবচেয়ে বড় চাওয়া থাকে না অর্থ বা সম্পদ; তারা চান সন্তানের স্নেহ, উপস্থিতি এবং আন্তরিক খোঁজখবর। আর সেই মানবিক সম্পর্কই একটি সমাজকে সত্যিকার অর্থে সভ্য ও শিক্ষিত করে তোলে।