পবিত্র হজ মুসলমানদের জন্য জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এই মহান ইবাদত পালনের স্বপ্ন অনেকেই লালন করেন বছরের পর বছর। তবে সেই স্বপ্ন পূরণে যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও ধৈর্যের প্রয়োজন, তার অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছেন ইন্দোনেশিয়ার এক নারী তার নাম এমবাহ মার্সিয়াহ। তার বয়স হলো ১০৪ বছর।
২০২৬ সালে হজ পালনকারী সবচেয়ে বয়স্ক হাজি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন পূর্ব জাভার কেদিরি জেলার এই প্রবীণ নারী। বয়সের ভার ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি আল্লাহর ঘর জিয়ারতের স্বপ্ন পূরণ করেছেন, যা বিশ্বের লাখো মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ
এমবাহ মার্সিয়াহ ২০২১ সালে হজের জন্য নিবন্ধন করেন। কিন্তু তার হজযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল আরও বহু বছর আগে। তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন ঐতিহ্যবাহী পোরিজ বা জাউ বিক্রি করে। প্রতিদিনের সামান্য আয় থেকে একটু একটু করে টাকা জমাতেন একটি কৌটায়। হজ মিডিয়া সেন্টারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, `আমি জাউ বিক্রি করি। সামান্য সামান্য করে টাকা জমিয়েছি। একটি কৌটায় সেই টাকা রাখতাম। কোনো ঘাটতি থাকলে আমার ছেলে তা পূরণ করে দিত। এই ছোট ছোট সঞ্চয়ই একসময় তাকে হজে নিবন্ধনের মতো পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ করতে সাহায্য করে।
গোপন ছিল তার স্বপ্ন
এমবাহ মার্সিয়াহর হজে যাওয়ার স্বপ্নের আরেকটি বিশেষ দিক ছিল তার নীরব প্রচেষ্টা। দীর্ঘদিন তিনি কাউকে জানাননি যে হজের জন্য অর্থ জমাচ্ছেন। তিনি বলেন, `হজের জন্য টাকা জমাচ্ছি—এ কথা আমি কাউকেই বলিনি।‘ এমনকি তার নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীরাও বিষয়টি জানতেন না। পর্যাপ্ত অর্থ জমার পর তিনি প্রথমবারের মতো নিজের স্বপ্নের কথা আশপাশের মানুষকে জানান।

বয়স বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি
১৯২১ সালের ১ জুলাই জন্ম নেয়া এমবাহ মার্সিয়াহ বর্তমানে ১০৪ বছর বয়সী। বয়সের কারণে তিনি লাঠির সাহায্যে ধীরে ধীরে হাঁটেন। তবে হজের অধিকাংশ সময় তিনি হুইলচেয়ার ব্যবহার করেছেন। গত ২২ মে তিনি তার ৬৭ বছর বয়সী মেয়ে মুইদাহকে সঙ্গে নিয়ে মক্কায় পৌঁছান। পরিবারের সহযোগিতা এবং নিজের দৃঢ় মনোবলের কারণে তিনি সফলভাবে হজের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হন।
সুস্থ অবস্থায় হজের প্রস্তুতি
ইন্দোনেশিয়ার ১১২তম সুরাবায়া এমবারকেশন গ্রুপের প্রধান আবিসওয়াতুন নাধিরোহ জানিয়েছেন, হজের দ্বিতীয় দিনেও এমবাহ মার্সিয়াহ সুস্থ ছিলেন এবং হজের সব কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তার এই শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক দৃঢ়তা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ও প্রশংসনীয়।
অনুপ্রেরণার এক জীবন্ত উদাহরণ
এমবাহ মার্সিয়াহর গল্প শুধু একজন বৃদ্ধ নারীর হজ পালনের গল্প নয়; এটি ধৈর্য, পরিশ্রম, সঞ্চয় এবং আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, বয়স কোনো স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা নয়। আন্তরিক ইচ্ছা, অধ্যবসায় এবং আল্লাহর ওপর ভরসা থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায়েই মহান লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। ১০৪ বছর বয়সে হজ পালন করে এমবাহ মার্সিয়াহ আজ লাখো মুসলমানের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
হজ পালন: ইসলাম ধর্মের পবিত্র ইবাদত ও এর তাৎপর্য
হজ ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম মুসলমানদের ওপর জীবনে অন্তত একবার ফরজ করা হয়েছে। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো মুসলমান সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় গিয়ে এই মহান ইবাদত পালন করেন। হজ শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি, ধৈর্য, ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের এক অনন্য প্রতীক।
হজ মূলত নির্দিষ্ট সময়ে, অর্থাৎ ইসলামিক ক্যালেন্ডারের জিলহজ মাসে সম্পন্ন করা হয়। এই সময় মুসলমানরা কাবা শরীফের তাওয়াফসহ বিভিন্ন নির্দিষ্ট ধর্মীয় কার্যক্রম পালন করেন। হজের প্রতিটি ধাপে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা, যা একজন মুসলমানের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনে।
হজ ফরজ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। মুসলমান হওয়া, প্রাপ্তবয়স্ক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকা এর মূল শর্ত। পাশাপাশি আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হতে হয়, অর্থাৎ নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ রেখে হজে যাওয়া ও ফিরে আসার সক্ষমতা থাকতে হয়। শারীরিক সক্ষমতা এবং নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থাও হজ ফরজ হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
হজের সময় মুসলমানরা জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালন করেন। এর মধ্যে রয়েছে ইহরাম বাঁধা, কাবা শরীফ তাওয়াফ করা, সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করা, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা, মুজদালিফায় রাত যাপন, শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, কুরবানি করা এবং মাথা মুন্ডন বা চুল ছোট করা। এসব আমল ধাপে ধাপে সম্পন্ন করার মাধ্যমে হজ পূর্ণতা পায়।
হজের গুরুত্ব ইসলামে অত্যন্ত গভীর। এটি একজন মুসলমানকে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের শিক্ষা দেয় এবং জীবনের গুনাহ থেকে মুক্তির একটি বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। হজ মানুষকে ধৈর্যশীল, বিনয়ী এবং আত্মত্যাগী হতে শেখায়। একইসঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের একত্রিত করে ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের এক অনন্য দৃশ্য সৃষ্টি করে।
সব মিলিয়ে হজ একটি আত্মিক ও আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির মহান ইবাদত। এটি শুধু একটি সফর নয়, বরং জীবনের একটি বড় পরিবর্তনের অধ্যায়, যেখানে একজন মুসলমান আল্লাহর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ পান।
