ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ হলো বিশ্বকাপ। এখানে যেমন জন্ম নিয়েছে কিংবদন্তি, তেমনি দেখা গেছে অবিশ্বাস্য সব অঘটন। অনেক সময় শক্তিশালী দল হেরে গেছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলের কাছে, যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। চলুন দেখে নেয়া যাক বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কিছু অঘটন।
যুক্তরাষ্ট্র ১-০ ইংল্যান্ড (১৯৫০ সাল)
১৯৫০ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ছিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দলে ছিলেন খণ্ডকালীন খেলোয়াড়—ডিশওয়াশার, ডাকপিয়ন ও শিক্ষকও ছিলেন দলে। ম্যাচের ৩৮ মিনিটে জো গেটজেন্সের হেডে এগিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ইংল্যান্ড একের পর এক আক্রমণ করলেও গোলরক্ষক ফ্র্যাঙ্ক বোরগির দুর্দান্ত সেভে আর গোল করতে পারেনি ইংল্যান্ড। এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম বড় অঘটন হিসেবে ধরা হয়।

পশ্চিম জার্মানি ৩-২ হাঙ্গেরি (১৯৫৪ সাল)
হাঙ্গেরির “মাইটি ম্যাজার্স” দল ছিল সময়ের অন্যতম ভয়ঙ্কর দল। ফেরেঙ্ক পুসকাসের নেতৃত্বে তারা বিশ্বকাপের ফেভারিট ছিল এবং আগেই জার্মানিকে ৮-৩ গোলে হারিয়েছিল। ফাইনালে হাঙ্গেরি ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে পশ্চিম জার্মানি ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নেয়। এই ম্যাচটি “দ্য মিরাকল অব বার্ন” নামে পরিচিত।
উত্তর কোরিয়া ১-০ ইতালি (১৯৬৬ সাল)
দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। ম্যাচে ইতালির গুরুত্বপূর্ণ মিডফিল্ডার চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন এবং বদলি খেলোয়াড় নামানোর সুযোগ না থাকায় তারা ১০ জনে পরিণত হয়। এরপর পাক ডু ইকের একমাত্র গোলে ইতালিকে বিদায় করে দেয় উত্তর কোরিয়া।

আলজেরিয়া ২-১ পশ্চিম জার্মানি (১৯৮২ সাল)
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন পশ্চিম জার্মানি ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট। কিন্তু তুলনামূলক অখ্যাত আলজেরিয়া সবাইকে চমকে দেয়। রাবাহ মাজেরের গোলের পর ম্যাচে ফিরে এলেও শেষ পর্যন্ত লাখদার বেল্লুমির গোলে হার মেনে নেয় জার্মানি। এটি আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম বড় জয় হিসেবে ধরা হয়।
ক্যামেরুন ১-০ আর্জেন্টিনা (১৯৯০ সাল)
ডিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ছিল বড় ফেভারিট। কিন্তু বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া ক্যামেরুন তাদের স্তব্ধ করে দেয়। ফ্রাঁসোয়া ওমাম-বিয়িকের হেডে ১-০ গোলের জয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমক উপহার দেয় আফ্রিকার দলটি।
ফ্রান্স ০-১ সেনেগাল (২০০২ সাল)
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স বনাম অভিষেককারী সেনেগাল—সবাই ভেবেছিল সহজ জয় পাবে ফরাসিরা। কিন্তু ৩০ মিনিটে পাপা বুবা দিয়পের গোলে ইতিহাস গড়ে সেনেগাল। ফ্রান্স পরে গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেয়, আর সেনেগাল কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যায়।
জার্মানি ৭-১ ব্রাজিল (২০১৪ সাল)
এটি শুধু অঘটন নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি। নিজেদের মাঠে ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন দেখছিল ব্রাজিল। কিন্তু সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয় তারা। মাত্র ২৩ থেকে ২৯ মিনিটের মধ্যে ৪ গোল খেয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো ব্রাজিল। এই ম্যাচকে “মিনেইরাওয়ের ট্র্যাজেডি” বা জাতীয় অপমান হিসেবেও দেখা হয়।
নেদারল্যান্ডস ৫-১ স্পেন (২০১৪ সাল)
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন স্পেন শুরুতে এগিয়ে গেলেও রবিন ফন পার্সির অবিশ্বাস্য হেডার ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নেদারল্যান্ডস ৫-১ গোলে উড়িয়ে দেয় স্পেনকে। এটি ছিল বিশ্বকাপে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দলের সবচেয়ে বড় হারগুলোর একটি।
দক্ষিণ কোরিয়া ২-০ জার্মানি (২০১৮ সাল)
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির সামনে ছিল নকআউটে ওঠার সুযোগ। কিন্তু ইনজুরি টাইমে দক্ষিণ কোরিয়া দুই গোল করে জার্মানিকে বিদায় করে দেয়। এটি ছিল বিশ্বকাপে কোনো এশিয়ান দলের কাছে জার্মানির প্রথম হার।

সৌদি আরব ২-১ আর্জেন্টিনা (২০২২ সাল)
৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকা আর্জেন্টিনা এবং লিওনেল মেসির দল ছিল শিরোপার বড় দাবিদার। মেসির পেনাল্টিতে এগিয়ে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধে সালেহ আল-শেহরি ও সালেম আল-দাওসারির গোলে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয় সৌদি আরব। যদিও শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জেতে, তবুও এই ম্যাচটি ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে জায়গা করে নেয়।
বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হলো অঘটন। এখানে ছোট দলও বড় দলকে হারিয়ে ইতিহাস গড়তে পারে। আর এসব অবিশ্বাস্য ম্যাচই ফুটবলকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে। ২০২৬ বিশ্বকাপেও হয়তো দেখা যাবে নতুন কোনো ‘জায়ান্ট কিলার’।