সম্প্রতি হেপাটাইটিস বি ও সিতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন কন্টেন ক্রিয়েটর কারিনা কায়সার। সেই মৃত্যুর রেশ না কাটতেই সামনে আসে গায়িকা সনিকা হেপাটাইটিস ‘এ’-তে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির খবরটি। অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটনা দু’টি সামনে এলেও অনেকটা নিরবেই দেশে হেপাটাইটিস ভাইরাস বিশেষ করে বি ও সি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে বলে বিভিন্ন তথ্য উপাত্তে উঠে এসেছে। হেপাটাইটিস পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চঝুঁকিতে থাকা ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসারা জানান, হেপাটাইটিস মানে লিভারে প্রদাহ। সাধারণত ভাইরাসজনিত সংক্রমণের মাধ্যমে এটি হয়ে থাকে। এ, বি, সি, ডি ও ই এই ৫ ধরনের ভাইরাসের কারণে হেপাটাইটিস বা লিভারের প্রদাহ হয়ে থাকে। এরমধ্যে হেপাটাইটিস এ ও ই খাদ্য ও পানিবাহিত। যা থেকে স্বল্পমাত্রার জন্ডিস হয়ে থাকে। এটি সাধারণত ৪ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাধ্যমে সেরে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক লিভার বিকল হতে পারে।
অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, অনিয়ন্ত্রিত সুঁই, সিরিঞ্জ ব্যবহার ও অনিরাপদ দৈহিক সম্পর্কের মাধ্যমে হেপাটাইটিস ছড়ায়। নাক-কান ফুটো, ট্যাটু করা, সংক্রমিত ব্যক্তির টুথব্রাশ ও শেভিং যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে বি এবং সি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া বিশ্বে এখন মদ্যপান জনিত কারণেও হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের কারণে লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি হেপাটাইটিস বি এবং ৫ বছরের নিচে ১ শতাংশের (১৬ লাখ ৬০ হাজার) কিছু কম সংখ্যক মানুষ হেপাটইিটস-সি ভাইরাসে আক্রান্ত। সি ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসে ২৩ হাজার মানুষ মারা যান।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- অনেক ক্ষেত্রে হেপাটাইটিসের কোনো উপসর্গ থাকে না, ফলে রোগীরা বুঝতেই পারেন না যে তারা আক্রান্ত। তাই হেপাটাইটিসকে ‘সাইলেন্ট কিলার’ বলা হয়। এই ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি ৯ জনে মাত্র ১ জন জানেন যে তিনি সংক্রমিত। অর্থাৎ ৮ জনই জানেন না তিনি এই ভাইরাসে সংক্রমিত। বি এবং সি ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের কারণে সবচেয়ে বিপজ্জনক। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এর ফল হতে পারে লিভার সিরোসিস, লিভার বিকল এবং এমনকি লিভার ক্যান্সার।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের ২০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক শরণার্থীর শরীরে সক্রিয় হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া যায় বলে এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে। স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘মেডিসিন্স স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) ২০২৩ সালের মে থেকে জুন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি সমীক্ষা করে। ৭টি ক্যাম্পে ৬৮০টি পরিবারের মধ্যে সমীক্ষাটি করা হয়। ফলাফলে দেখা যায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তাদের জীবনের কোনো না কোনো সময়ে হেপাটাইটিস সংক্রমণের সংস্পর্শে এসেছিল।
এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশের মধ্যে সক্রিয় ‘হেপাটাইটিস সি’ সংক্রমণ রয়েছে। ওই সময় সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সীমিত পরিসরে চালানো এই সমীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে পুরো রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের তুলনা করলে বোঝা যায়, প্রায় ৫জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন বর্তমানে এইচসিভি সংক্রমণের সঙ্গে বসবাস করছেন। সংখ্যার দিক থেকে শরণার্থীদের মধ্যে আনুমানিক ৮৬ হাজার ৫০০ মানুষ ‘হেপাটাইটিস সি’ ভাইরাস সংক্রমণে ভুগছেন।
এদিকে বারডেম হাসপাতালের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হেপাটাইটিস-বি এবং শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিস-সি ভাইরাসে আক্রান্ত। এর মধ্যে বি ভাইরাসে আক্রান্ত পরিবারের ২৮ শতাংশই সংক্রমিত হচ্ছে নীরব ঘাতক এ রোগে। হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত একশ রোগীর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গবেষণা করে বারডেম হাসপাতাল। সেখানে ২৮ ভাগের বেশি বি ভাইরাস শনাক্ত হয়।
বাংলাদেশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি সোসাইটির মহাসচিব অধ্যাপক ডা. দেওয়ান সাইফুদ্দিন আহমেদ জানান, বিশ্বব্যাপী লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস বি এবং সি। লিভার ক্যান্সারে শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে দায়ী এই দুইটি ভাইরাস।
তিনি বলেন, ভাইরাল হেপাটাইটিস একটি গুরুতর রোগ যা লিভারের প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসার অভাবে প্রতিদিনই বাড়ছে এই নীরব ঘাতকের ভয়াল থাবা। বাংলাদেশে আনুমানিক ৫ থেকে ৭ শতাংশ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি অথবা সি ভাইরাসে আক্রান্ত। গ্রামীণ জনপদ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় সচেতনতার অভাব, নিরাপদ রক্ত সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা-ব্যবস্থার অভাবে সংক্রমণ আরো বাড়ছে।
বিখ্যাত গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জাকির হোসেন জানান, হেপাটাইটিস কোনো ছোঁয়াচে রোগ না হলেও সহজেই এর বিস্তার বা সংক্রমণ ঘটে। প্রতিষেধকের মাধ্যমে ভাইরাসটি প্রতিরোধ করা গেলেও সংক্রমিতরা পদে পদে বঞ্চনার শিকার হন। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসায় গুরুত্ব দিতে হবে। রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে অনেক সময় হেপাটাইটিস-সিতে আক্রান্ত হতে পারেন। ফলে এখন রক্ত দেয়ার সময় হেপাটাইটিস বি, সি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। অনেক সময়েই আগে কোন লক্ষণ-উপসর্গ দেখা যায় না। কিন্তু রক্ত পরীক্ষার পরেই হেপাটাইটিস-সি ধরা পড়ে।
জানা যায়, বিদেশ যাবার ক্ষেত্রে মেডিকেল টেস্টে হেপাটাইটিস পজিটিভ হলে অনেক রাষ্ট্রের ভিসা দেয়া হয় না। বিসিএসসহ সরকারি চাকরিতে নেয়া হয় না। কিডনি রোগীর হেপাটাইটিস পজিটিভ হলে বেশিরভাগ হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করানো যায় না। আক্রান্তরা স্বেচ্ছায় রক্তদান, ক্যাডাভারিক ট্রান্সপ্লান্টের জন্য কিডনি দান, মরণোত্তর চক্ষুদানসহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করতে পারেন না। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সারা বিশ্ব থেকে বি, সি ভাইরাস এবং লিভার ক্যান্সার নির্মূলের কথা বলা হয়েছে। হেপাটাইটিস নির্মূলে সচেতনতার পাশাপাশি জনগণের দোরগোড়ায় চিকিৎসার ব্যবস্থা পৌঁছাতে হবে।
করণীয় প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, হেপাটাইটিস প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, বিশুদ্ধ খাবার খাওয়া, হাত ধোয়া, নিরাপদ রক্তদান ও গ্রহণ, জীবাণু মুক্ত চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ব্যবহার, হেপাটাইটিস এ এবং বি এর টিকা নেয়া, হেপাটাইটিস বি ও সি এর পরীক্ষা করা। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
কারণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মা আক্রান্ত হলে সন্তানের শরীরেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। গর্ভাবস্থায় সঠিক চিকিৎসা ও জন্মের সাথে সাথে বাচ্চাকে টিকা দিলে সংক্রমণ ঝুঁকি ৯০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে কমানো সম্ভব। নিরাপদ স্বাস্থ্যচর্চা যেমন ইনজেকশন, দাঁতের চিকিৎসা, ব্লেড, কানের ছিদ্র এবং রক্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করার উপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
ফ্যাটি লিভারের বিষয়েও সতর্ক করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, ফ্যাটি লিভার ইদানিং অনেক বেড়ে যাচ্ছে এবং হেপাটাইটিসের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। ফ্যাটি লিভারের তেমন কার্যকর ওষুধ নেই। তাই সুস্থ জীবনযাপনই ভরসা। ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত কায়িক শ্রম ও সুষম পুষ্টিকর খাদ্যভ্যাস জরুরি।