ঈদ যাত্রায় সড়ক পথে এবার ভোগান্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিভিন্ন মহাসড়কের শতাধিক স্পটে যানজটের সম্ভাবনা রয়েছে। শুক্রবার থেকে ঈদ যাত্রা শুরু হলে ওইসব স্পটে যাত্রী ও যানবাহন চালকদের ভোগান্তিতে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। মূলতো এইদিন থেকেই সড়ক মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামবে। কোরবানির পশুবাহি যানবাহন অবাধে চলাচলের কারনে অনেক স্থানে সড়ক-মহাসড়রকর উভয় পাশেই যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ থাকবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে রাস্তা খারাপ থাকায় এবার বেশি হতে পারে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ নানামূখী ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। দেশের সাতটি প্রধান মহাসড়কে যানজটপ্রবণ গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাব্য ৯৪টি স্পট (স্থান) চিহ্নিত করেছে। কোনো কোনো স্পটে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করার প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর রিজিয়নের চিহ্নিত দেশের প্রধান সাতটি মহাসড়কের ৯৪টি যানজটপ্রবণ গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সড়ক মেরামত, সংস্কারকাজ, রাস্তার সংকীর্ণতা এবং অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে যানজট সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের গাজীপুর এলাকার সড়ক-মহাসড়কগুলো ব্যবহার করেই যেতে হবে।
এই রুটের যাত্রীদের অর্থাৎ ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কের ২৫টি স্পট এবার যানজটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই স্পটগুলো হলো- চন্দ্রা ফ্লাইওভারের পশ্চিম প্রান্ত, স্কয়ার কাটা, কালিয়াকৈর বাইপাস, সফিপুর, মৌচাক, এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড, করোটিয়া হাট বাইপাস, যমুনা সেতু টোলপ্লাজা এলাকা, বনানী মোড়, টিএমএসএস মেডিকেল হাসপাতালের সামনে, মহাস্থান, বগুড়া-ঢাকা বাসস্ট্যান্ড মোড় ওয়াচ টাওয়ার-২, নয় মাইল বাজার, শেরপুর উপজেলা গেট, ধুনট মোড়, নাবিল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের সামনে ইউটার্ন, ফুড ভিলেজ হোটেল, পেন্টাগন হোটেল, পাবনা-বগুড়া-রংপুরগামী ইউটার্ন মোড়, হাটিকুমরুল ওভারব্রিজের আন্ডারপাস, বগুড়া-ঢাকাগামী বাসস্ট্যান্ড মোড় হাটিকুমরুল, হানিফ রেস্টুরেন্টের সামনে, চান্দাইকোনা বাজার এবং গোবিন্দগঞ্জ মায়ামনির মোড় এলাকা।
এদিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষের এবার দুর্ভোগ বাড়ার শঙ্কা করা হচ্ছে। এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটার মহাসড়কের চার লেনের উন্নয়ন কাজ এখনো শেষ হয়নি। কয়েক দফা সময় বাড়িয়েও প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৫০ শতাংশ। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে কাজের ধীরগতি বলে অভিযোগ পরিবহন চালক ও যাত্রীদের। ঢাকার সঙ্গে সড়ক পথে উত্তরবঙ্গের একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম এই মহাসড়কটি। প্রতি ঈদ যাত্রায় এই মহাসড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সড়কের চার লেন প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। এলেঙ্গায় মহাসড়কের এ অংশে ফ্লাইওভারের কাজ চলমান থাকায় সংকুচিত হয়ে পড়ে মহাসড়কের প্রশস্ততা। তাই প্রতিনিয়তই যানজট লাগছে। সাসেক-২ প্রকল্পের আওতায় ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে টেন্ডারের মাধ্যমে এ মহাসড়ক উন্নীতকরণের কাজ পায় আব্দুল মোনায়েম লিমিটেড। ২০২২ সালের মার্চ মাসে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে পুনরায় তা ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রকল্পে মোট ৮টি ব্রিজ, ১০টি কালভার্ট, ৩টি আন্ডারপাস ও একটি ফ্লাইওভার রয়েছে। ব্রিজ ও কালভার্টের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আন্ডারপাসের পাইলিং শেষ হয়েছে। ফ্লাইওভারে পাইলিংও শেষের দিকে। মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে সেতু পর্যন্ত চার লেনের কাজ চলছে। এলেঙ্গার পর থেকে সিঙ্গেল লাইন। ফলে ঈদ যাত্রায় এবার ভোগান্তি হবে।
পরিবহন চালকরা অভিযোগ করেন, সারাবছর কাজ বন্ধ থাকে। ঈদের আগে কাজ শুরু হয়। এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত চার লেনের কাজ চলছে। সার্ভিস লেনের কাজ এখনো শেষ হয়নি। এবারো এই মহাসড়ক ব্যবহারকারীরা চার লেনের সুবিধা পেলেও পুরোপুরি সুবিধা পাবে না। এখনো মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে কাজ করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে আবদুল মোনায়েম লিমিটেডের প্রজেক্ট ম্যানেজার রবিউল আওয়াল জানিয়েছেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় আবারো এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এরই মধ্যে ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে আসন্ন ঈদযাত্রায় মহাসড়কের দুই পাশেই চার লেন যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও ২৫টি স্পট চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এই স্পটগুলো হলে- মেঘনা টোলপ্লাজা, এশিয়ান রোড (মদনপুর হতে বস্তুল), ধলেশ্বরী টোলপ্লাজা, গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড, আমিরাবাদ বাসস্ট্যান্ড, চান্দিনা বাজার, মাধাইয়া বাজার, নিমসার বাজার, ক্যান্টনমেন্ট মোড়, পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, মিয়ারবাজার উভয় লেন, চৌদ্দগ্রাম বাজার ঢাকামুখী লেন, বেসিক মোড়, লালপোল, কসকা বাজার, সমিতি বাজার, বারইয়ারহাট, মিরসরাই, সীতাকুন্ড বাসস্ট্যান্ড, বড় দারোগার হাট ওজন স্কেল, ফুটলিং, ছোট কুমিরা, কেডিএস মোড়, ভাটিয়ারী পয়েন্ট ও বারবকুন্ড বাজার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশেষ করে ভুলতা সড়কের অবস্থা খুবই খারাপ থাকায় যানবাহন চালকরা বাধ্য হয়ে এশিয়ান হাইওয়েতে উঠেছে। কিন্তু এখানেও তীব্র যানজট শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার এই মহাসড়কের মদনপুর এলাকায় দীর্ঘ ১০ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতা-গাউছিয়া সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙ্গে যাওয়ায় এই সড়কের অবস্থা বেগতি। একারনে বিকল্প পথ হিসেবে এশিয়ান হাইওয়ে ব্যবহার করছে অধিকাংশ যানবাহন। এতে বুধবার (২০ মে) সকাল থেকে মদনপুর এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
যানবাহন চালকরা জানান, ভুলতা-গাউছিয়া সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ও বড় বড় খানাখন্দের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি এতোটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। মদনপুর, কাঁচপুর, সাইনবোর্ড ও শিমরাইল এলাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও দূরপাল্লার বাসগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে সড়কের ওপর। যানজট ছড়িয়ে পড়েছে সাইনবোর্ড পর্যন্ত। একই সঙ্গে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও ডেমরা-স্টাফ কোয়ার্টার সড়কেও দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা যায়।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম শেখ জানান, কয়েকদিন ধরেই ভুলতা-গাউছিয়া সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে বিকল্প সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ছে। দ্রুত সড়ক সংস্কার না করা হলে পরিস্থিতি আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। বিপুল সংখ্যক যানবাহন এশিয়ান হাইওয়েতে চলে আসায় মদনপুর, কাঁচপুর ও আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
অপরদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ২১টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো- কাঞ্চন ব্রিজের পশ্চিম পার্শ্বে গাউসিয়াগামী লেন, গ্রিন ইউনিভার্সিটির সামনে গাউসিয়াগামী লেন, রূপসী বাসস্ট্যান্ড, বরপা বাসস্ট্যান্ড, পাকিস্তানি (এসিএস) গার্মেন্টস, ছনপাড়া, ভেলানগর বাসস্ট্যান্ড, ইটাখোলা বাসস্ট্যান্ড, গোলায়া বাজার, শেরপুর মোড়, মাধবপুর বাজার ও আশপাশ এলাকা, শায়েস্তাগঞ্জ থানাধীন অলিপুর ও আশপাশ এলাকা, আশুগঞ্জ গোলচত্বর, বিশ্বরোড গোলচত্বর, ইসলামপুর বাজার ও বাসস্ট্যান্ড, মাধবপুর বাজার ও বাসস্ট্যান্ড, দুর্জয় মোড়, নিউ টাউন মোড়, বরাবো বাসস্ট্যান্ড, তারাবো গোলচত্বর এবং যাত্রামুড়া ব্রিজ।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চিহ্নিত ৭টি স্পট হলো- হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড, সাভার বাসস্ট্যান্ড, নবীনগর মোড়, বাইপাইল মোড়, ধলেশ্বর ব্রিজ (জাগীর), নয়াডিঙ্গি এবং বাপুলি বাসস্ট্যান্ড। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ভোগান্তি হতে পারে এমন ১টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এই স্পটটি হলো- মাদারীপুর সদর থানাধীন মোস্তফাপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকা। তবে সরু রাস্তার কারনে টেকেরহাট ব্রীজ এলাকাতেও যানজটের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চিহ্নিত ৭টি স্পট হলো- ভবানীপুর বাজার, বাঘেরবাজার, এমসি বাজার, জৈনা বাজার, স্কয়ার মাস্টারবাড়ি, সিডস্টোর এবং ভরাডোবা বাসস্ট্যান্ড।
হাইওয়ে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সড়কের যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ঈদুল আজহার সাত দিন আগে থেকে ঈদের তিন দিন পর পর্যন্ত টোল প্লাজা ও যানজটপ্রবণ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যানজটপ্রবণ এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত এক হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে— কর্ণফুলী সেতু, মেঘনা সেতু, গোমতী সেতু, পায়রা সেতু, খান জাহান আলী (রূপসা) সেতু, ভৈরব সেতু, কাঞ্চন সেতু, আত্রাই টোল প্লাজা, নাটোর, লালন শাহ সেতু, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের উভয় মুখে, হানিফ ফ্লাইওভার, বাইপাইল, নবীনগর, গাজীপুর চৌরাস্তা, মদনপুর মোড়, কাঁচপুর, মোগড়াপাড়া, পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু, পঞ্চবটী মুক্তারপুর সেতু এবং ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উভয় মুখে।
হাইওয়ে পুলিশের এডিশনাল ডিআইজি (পূর্ব) মুনতাসিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঈদ সামনে রেখে সম্ভাব্য যানজটপূর্ণ ৯৪টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থানে সড়ক মেরামত ও সংস্কারকাজ, রাস্তার সংকীর্ণতা, প্রবেশমুখে চাপ এবং টোল প্লাজায় অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে যানজট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কোনো যানবাহন বিকল হলে দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা থাকে। তবে, আগাম পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সহনীয় রাখার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আগামী ২৫ তারিখের পর যেন কোনো সংস্থা রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি বা সংস্কারকাজ না করে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্কারকাজের সরঞ্জাম বা নির্মাণসামগ্রী যেন সড়কে ফেলে রাখা না হয় এবং রাস্তা চলাচল উপযোগী রাখা হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।