আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে নাটোরের গুরুদাসপুরে জমে উঠেছে দুম্বার খামারকেন্দ্রিক ব্যতিক্রমী আয়োজন। মরুভূমির প্রাণী দুম্বা দেখতে ও কিনতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় করছেন ক্রেতা, খামারি ও উৎসুক দর্শনার্থীরা।
মাত্র চারটি ছাগল দিয়ে যাত্রা শুরু করা দুই ভাইয়ের স্বপ্ন আজ ৩২ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা তিন শতাধিক পশুর আধুনিক খামারে পরিণত হয়েছে। ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে খামারজুড়ে বেড়েছে বেচাকেনা, প্রাণচাঞ্চল্য আর মানুষের উপচেপড়া উপস্থিতি। যেন গ্রামের বুকেই বসেছে প্রাণিসম্পদের এক অনন্য উৎসবমুখর মেলা।
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খামার পাথুরিয়া গ্রামের সবুজ প্রান্তরে ৩২ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এই প্রাণিসম্পদ খামার। গরু, ছাগল, গাড়ল ও দুম্বা নিয়ে গড়ে ওঠা খামারটি এখন এলাকাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে খামারের বিশালাকৃতির দুম্বাগুলো দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
এই খামারের স্বপ্নদ্রষ্টা দুই ভাই আনোয়ার হোসেন ও হান্নান সরকার। অভাব-অনটনের সংসারে ১৯৯৫ সালে মাত্র চারটি ছাগল দিয়ে শুরু হয়েছিল তাদের পথচলা। সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগই আজ পরিণত হয়েছে আধুনিক ও সুপরিকল্পিত বৃহৎ খামারে। দীর্ঘ তিন দশকের নিরলস পরিশ্রম, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও অদম্য সাহসিকতায় তারা বদলে দিয়েছেন নিজেদের ভাগ্যের পাশাপাশি এলাকার অর্থনীতির চিত্রও।
স্থানীয়রা জানান, ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী ছিলেন আনোয়ার হোসেন। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েই পশুপালনে মনোযোগ দেন তিনি। শুরুতে অর্থসংকট, পশুর রোগব্যাধি, খাদ্য সংকট ও লোকসানের মতো নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। সামাজিক কটূক্তিও সহ্য করতে হয়েছে। তবুও থেমে যাননি তারা। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পনার সমন্বয়ে গড়ে তুলেছেন সফল একটি খামার।
বর্তমানে খামারটিতে বিভিন্ন উন্নত জাতের গরু, ছাগল, গাড়ল ও দুম্বাসহ তিন শতাধিক পশু রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখন দুম্বা। ঈদ উপলক্ষে খামারের ৩৬টি দুম্বা বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। জাত, আকার ও ওজনভেদে প্রতিটির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতারা খামারে আসছেন। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে আসছেন ব্যতিক্রমী এই প্রাণীগুলো দেখতে।
খামারের অন্যতম উদ্যোক্তা হান্নান সরকার জানান, মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর দুই-তিনটি ছাগল পালন দিয়েই তাদের সংগ্রাম শুরু। পরে ২০১০ সালে বড় পরিসরে খামার গড়ে তোলেন তারা। ব্যবসায়ীদের সহায়তায় ভারত থেকে সংগ্রহ করেন ৪টি দুম্বা । সেই চারটি দুম্বা থেকেই বর্তমানে তাদের খামারে প্রায় ৬০টি দুম্বা রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন উন্নত প্রজাতির প্রায় ২০০টি ছাগল, ৪০টি গাড়ল ও গরুসহ তিন শতাধিক পশু রয়েছে খামারটিতে।
তিনি বলেন, “আগে মানুষ দুম্বা সম্পর্কে খুব বেশি জানত না। এখন কোরবানির পশু হিসেবে দুম্বার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসছেন। অনেকে এখান থেকে দুম্বা কিনে নিজেরাও খামার গড়ে তুলছেন।” বর্তমানে খামারটিতে ২৩ জন শ্রমিক কাজ করছেন। এদের অধিকাংশই স্থানীয় বেকার যুবক।
শ্রমিক শফিকুল ইসলাম বলেন, “ঈদের সময় এখানে কাজের চাপ অনেক বেড়ে যায়। তবে এই খামারই এখন আমাদের জীবিকার বড় ভরসা।” খামারের প্রাণীগুলোকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাদ্য খাওয়ানো হয়। প্রতিদিন খড়, ভূষি ও তাজা ঘাস সরবরাহ করা হয়। পশুর খাদ্য নিশ্চিত করতে প্রায় সাড়ে ছয় বিঘা জমিতে উন্নত জাতের ঘাস চাষ করেছেন তারা।
শুধু নিজেদের খামারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি আনোয়ার হোসেন। এলাকার তরুণদের খামার গড়ে তুলতে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতাও করছেন তিনি। তাঁর অনুপ্রেরণায় এলাকায় গড়ে উঠেছে আরও কয়েকটি ছোট-বড় খামার। ফলে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
আনোয়ার হোসেন বলেন, “শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে যুবসমাজ যদি খামারভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে এগিয়ে আসে, তাহলে বেকারত্ব অনেক কমে যাবে। পরিশ্রম ও সততা থাকলে সফলতা আসবেই।” খামারটি দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন নানা এলাকার মানুষ।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ থেকে আসা দর্শনার্থী কবির হোসেন বলেন, “দুম্বা আগে শুধু ভিডিওতে দেখেছি। এখানে এসে সরাসরি দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি।”
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দীন বলেন, “বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে দুম্বা এখন ভালোভাবেই মানিয়ে নিচ্ছে। গুরুদাসপুরে বড় পরিসরে দুম্বা পালন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রাণিসম্পদ দপ্তর নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।”
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন কোরবানির ঈদ উপলক্ষে নাটোর জেলায় ২১ হাজার ৩৭৪টি খামারে মোট ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৪৪৭টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলার চাহিদার তুলনায় উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ। উদ্বৃত্ত পশু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হবে।
চারটি ছাগল থেকে শুরু হওয়া আনোয়ার-হান্নান ভাইদের এই সাফল্যের গল্প এখন শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি গ্রামীণ উদ্যোক্তা, আত্মবিশ্বাস ও সম্ভাবনার এক অনুপ্রেরণাদায়ী প্রতিচ্ছবি। তাদের খামার যেন প্রমাণ করে—পরিকল্পনা, পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে গ্রামের মাটিতেও গড়ে উঠতে পারে সফলতার বিশাল সাম্রাজ্য।