মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র এখন আর কেবল ওই অঞ্চলের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। সোমবার ইরান যখন বিশ্ববাণিজ্যের ধমনী হরমুজ প্রণালি বন্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিল, তখন কেঁপে উঠল বিশ্ব অর্থনীতি।
ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি—কোনো জাহাজ এই পথ অতিক্রমের চেষ্টা করলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেবে রেভোল্যুশনারি গার্ড। এই এক ঘোষণায় স্থবির হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। পারস্য উপসাগরীয় সাতটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা এখন এক অনিশ্চিত গন্তব্যের মুখে।
পরিসংখ্যান বলছে, এই সংকট সাধারণ কোনো ধাক্কা নয়। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইরান, কাতার, কুয়েত, আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ এই অঞ্চলের সাত দেশ থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য।
সমুদ্র কিংবা আকাশ—সব পথ এখন কার্যত রুদ্ধ। আমাদের তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হিমায়িত মাছ আর শাকসবজি রপ্তানিকারকেরা এখন দিশেহারা। বিদেশের চার বন্দরে এবং বাংলাদেশের ডিপোগুলোতে আটকা পড়েছে এক হাজারের বেশি রপ্তানি কন্টেইনার।
আরো পড়ুন: তেহরানের নতুন রণকৌশল কুপোকাত পশ্চিমারা
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর অবস্থা এখন সংকটাপন্ন। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, যারা বছরে ৫৪ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, তাদের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বাজারই মধ্যপ্রাচ্য। বর্তমানে তাদের ৬০০ কন্টেইনার পণ্য বিভিন্ন বন্দরে ও সাগরে আটকা।
শুধু তাই নয়, প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল পেট্রোকেমিক্যাল আমদানি বন্ধ হওয়ায় ১০ থেকে ১২ হাজার টনের শিপমেন্ট বাতিল হয়েছে। টি কে গ্রুপের ৪০ কন্টেইনার পণ্য মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
হিমায়িত মাছ রপ্তানিকারক রিভরাইন ফিশের শতাধিক কন্টেইনার এখন পচনের ঝুঁকিতে। ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়—ঈদের আগে বেতন-ভাতা দেওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি জ্বালানি তেল ও গ্যাস।
বিপিসির তথ্যমতে, কেরোসিন ছাড়া অন্যান্য জ্বালানির মজুত আছে মাত্র দুই থেকে চার সপ্তাহের। সিপিডির মোস্তাফিজুর রহমান এবং সানেমের সেলিম রায়হানের মতো অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন—যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এলএনজির দাম আকাশচুম্বী হবে, যা দেশের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতিকে এক ভয়ানক পর্যায়ে নিয়ে যাবে। বিকল্প উৎস খুঁজে না পেলে আমাদের শিল্প উৎপাদন থমকে যেতে পারে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই।
হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা কেবল একটি যুদ্ধ নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য এক অর্থনৈতিক অগ্নিপরীক্ষা। দ্রুত বিকল্প বাজার এবং জ্বালানি আমদানির উৎস খুঁজে না বের করলে শাটডাউনের দিকে যেতে পারে বহু কলকারখানা।
সময়ের ঘড়ি টিকটিক করছে; এখন দেখার বিষয়, এই মহাপ্লাবন থেকে অর্থনীতিকে বাঁচাতে সরকার ও ব্যবসায়ীরা কতটা দ্রুত কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে।