হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের মুখে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় একটি পবিত্র দোয়া- ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’। এটি মূলত তালবিয়া নামে পরিচিত। হজ বা ওমরাহর ইহরাম বাঁধার পর মুসল্লিরা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে এই দোয়া পাঠ করেন। অনেকেই এর পুরো দোয়া ও বাংলা অর্থ জানতে চান। তাই আজকের এই ব্লগে তুলে ধরা হলো লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক পুরো দোয়া বাংলা অনুবাদসহ।
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক পুরো দোয়া (আরবি)
لَبَّيْكَ اللّٰهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيْكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيْكَ لَكَ
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক পুরো উচ্চারণ (বাংলা)
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক।
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক পুরো বাংলা অনুবাদ
“আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির। আমি হাজির, আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা, সকল নেয়ামত এবং রাজত্ব একমাত্র আপনারই। আপনার কোনো শরিক নেই।”
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক এর অর্থ কী?
‘লাব্বাইক’ শব্দের অর্থ হলো ‘আমি উপস্থিত’ বা ‘আমি আপনার ডাকে সাড়া দিচ্ছি’। একজন মুসলমান যখন হজ বা ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে আল্লাহর ঘরের পথে বের হন, তখন তিনি এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি নিজের আনুগত্য, ভালোবাসা ও আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেন। এই তালবিয়া দোয়ার মাধ্যমে একজন বান্দা স্বীকার করেন যে— আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। সব প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। সমস্ত নেয়ামত ও ক্ষমতার মালিক আল্লাহ। তাঁর কোনো অংশীদার নেই।
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক কখন পড়া হয় এই দোয়া?
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক মূলত হজ ও ওমরাহর সময় পড়া হয়। ইহরাম বাঁধার পর থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত হাজিরা এই দোয়া বারবার পাঠ করেন। বিশেষ করে— মিকাত অতিক্রমের পর। মক্কার পথে যাত্রাকালে। হজের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায়।
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক কেন এই দোয়া গুরুত্বপূর্ণ?
এই দোয়া শুধু মুখের উচ্চারণ নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি একজন মুমিনের আত্মসমর্পণের প্রতীক। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর সবকিছু ছেড়ে একজন মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর ডাকে সাড়া দিচ্ছে।
হজে তালবিয়া পাঠের নিয়ম: পুরুষদের উচ্চস্বরে, নারীদের কেন নিচু স্বরে?
পুরুষ উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করবেন এবং নারীরা পড়বেন নিম্নস্বরে। (মানাসিক, পৃষ্ঠা: ১০০, আদ্দুররুল মুখতার, পৃষ্ঠা: ৪৮৪)। সাইব ইবনে ইয়াজিদ (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমার কাছে জিবরাইল (আ.) এসে বললেন, আমি যেন আমার সাহাবিদের উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠের নির্দেশ দিই।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১/১৭১)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নারীরা উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করবেন না। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস: ১৪৮৮২)
মুহাম্মদ-এর সাহাবি সাইব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “আমার কাছে জিবরাইল (আ.) এসে বললেন, আমি যেন আমার সাহাবিদের উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠের নির্দেশ দিই।”- তিরমিজি, হাদিস: ৮২৮ (সংখ্যা সংস্করণভেদে ভিন্ন হতে পারে)
এই হাদিস থেকে ইসলামি স্কলাররা বলেন, পুরুষদের জন্য তালবিয়া এমনভাবে পড়া সুন্নত, যাতে নিজে এবং আশপাশের লোক শুনতে পারে, তবে তা চিৎকার করে বা অন্যকে কষ্ট দিয়ে নয়। এর উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে: “নারীরা উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করবেন না।- মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা, হাদিস: ১৪৮৮২
ফিকহবিদরা ব্যাখ্যা করেছেন, নারীরা এমন স্বরে তালবিয়া পড়বেন যাতে তারা নিজেরা শুনতে পারেন, কিন্তু পরপুরুষের সামনে উচ্চস্বরে নয়। এর পেছনে শালীনতা ও পর্দার বিধান বিবেচনা করা হয়েছে। তাই আদ্দুররুল মুখতার ও মানাসিক–এর মতো ফিকহ গ্রন্থে বলা হয়েছে, পুরুষ উচ্চস্বরে এবং নারী নিম্নস্বরে তালবিয়া পাঠ করবেন।
কেন এই ভিন্নতা?
এটি মর্যাদার পার্থক্য নয়, বরং শরিয়তের বিধান ও শালীনতার নীতি অনুসারে আলাদা নির্দেশনা। পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রকাশ্যভাবে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার বিষয়টি উৎসাহিত করা হয়েছে, আর নারীদের জন্য নম্র ও সংযত স্বরকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।