রাজধানীর কুরবানির পশুর হাটগুলোতে এবার দেশজুড়ে পশুর সরবরাহ তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও কেনাবেচা এখনো প্রত্যাশিত গতি পায়নি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাক ও ট্রলারে করে গরু, ছাগল ও মহিষ ঢাকায় আসতে শুরু করেছে।
হাটগুলোতে পশুর উপস্থিতি বাড়লেও ক্রেতার সংখ্যা কম থাকায় বাজারে এক ধরনের অপেক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দিনভর তুলনামূলক শুষ্ক আবহাওয়া থাকলেও গতকাল রবিবার বিকেল থেকে ঢাকায় বৃষ্টি শুরু হওয়ায় অনেক হাটে মানুষের চলাচল আরো কমে যায়, ফলে বেচাকেনায় অতিরিক্ত ভাটা পড়ে।
গাবতলী স্থায়ী হাটসহ রাজধানীর পোস্তগোলা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ভাটারা, বছিলা, মেরুল বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, বনশ্রী, গোলাপবাগ, উত্তর শাহজাহানপুর, আমুলিয়া, কাজলা, মাতুয়াইল, উত্তরা দিয়াবাড়িসহ মোট ১৯টি অস্থায়ী হাটে একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। হাটগুলোতে বিভিন্ন আকারের দেশি ও সংকর জাতের গরু সারিবদ্ধভাবে রাখা হলেও ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম। বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর অনেক হাটে ক্রেতারা কেনাকাটা না করে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেন, ফলে দরদাম আলোচনাও কমে যায় এবং অনেক জায়গায় হাট কার্যত অর্ধ-নিষ্ক্রিয় অবস্থায় চলে যায়।
হাটে আসা মানুষের বড় অংশই মূলত ঘুরে দেখা, দাম জিজ্ঞাসা এবং পশু যাচাই-বাছাই করছেন। তবে বড় ধরনের লেনদেন এখনো শুরু হয়নি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, শেষ মুহূর্তে বিক্রি বাড়বে এমন প্রত্যাশায় তারা পশু ধরে রেখেছেন। তবে বৃষ্টির কারণে বিকেলের দিকের সময়টিতে ক্রেতার চাপ আরো কমে যাওয়ায় অনেক বেপারি কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
গাবতলী হাটে মাঝারি আকারের গরুর দাম বর্তমানে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠছে। বড় গরুর ক্ষেত্রে দাম ২ থেকে ৪ লাখ টাকা বা তারও বেশি চাওয়া হচ্ছে, যা মাংসের পরিমাণ ও জাত অনুযায়ী নির্ধারিত। কিন্তু এই দামের বিপরীতে ক্রেতার আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম।
গাবতলী হাটে চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা বেপারি শফি বিশ্বাস জানান, তিনি ১৪টি দেশি ষাঁড় এনেছেন। প্রতিটি গরুতে ৫ থেকে ৬ মণ মাংস পাওয়া যাবে বলে তিনি জানান। তার ভাষায়, খাদ্য, পরিবহন ও চিকিৎসা ব্যয় এত বেড়েছে যে মণপ্রতি ৩৫ হাজার টাকার নিচে বিক্রি করলে লোকসান হবে। একইহাটে কুষ্টিয়া এলাকার বেপারি গোলাপ বলেন, তিনি ২৫টি গরু এনেছেন, কিন্তু এখনো ক্রেতার দেখা মিলছে না বললেই চলে।
বেপারিরা বলছেন, পশুর খাদ্য, বিশেষ করে ধানের কুড়া, খড়, ভুসি এবং অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় অনেক বেশি। এরসঙ্গে পরিবহন ও শ্রমিক খরচ যোগ হওয়ায় মোট ব্যয় আরো বেড়েছে। ফলে তারা আগের দামে পশু বিক্রি করতে পারছেন না এবং দাম ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তবে বাজারে ক্রেতার চাপ না থাকায় এই কৌশলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অন্যদিকে ক্রেতাদের মধ্যেও এখনো বড় কেনাকাটা শুরু হয়নি।
অনেকেই হাটে এসে গরু দেখছেন, দাম জিজ্ঞাসা করছেন, কিন্তু কিনছেন না। তাদের অনেকের ধারণা, ঈদ আরো ঘনিয়ে এলে শেষ মুহূর্তে দর কিছুটা কমতে পারে। আবার ঢাকায় বসবাসকারীদের একটি বড় অংশ জানাচ্ছেন, গরু রাখার জায়গার অভাব ও ব্যবস্থাপনার ঝামেলার কারণে তারা এখনই কেনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। বিকেলের বৃষ্টির কারণে অনেক ক্রেতা দ্রুত হাট ত্যাগ করায় সেই অপেক্ষার মনোভাব আরো দীর্ঘায়িত হয়েছে।
পোস্তগোলা বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ের হাটে নদীপথে ট্রলারে করে গরু আনা হচ্ছে, তবে সেখানে এখনো বড় কোনো বিক্রি শুরু হয়নি। ইজারাদার কাজী মাহবুব মাওলা হিমেল জানান, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পশু এসেছে, কিন্তু বাজার এখনো জমেনি। একইভাবে মাতুয়াইল এলাকার হাটেও ব্যাপারীরা জানান, হাট প্রস্তুত হলেও ক্রেতার উপস্থিতি কম।
মিরপুর, কালশী, খিলক্ষেত মস্তুল চেকপোস্ট, বনশ্রী, বাড্ডা, বড় বেরাইদ, মোহাম্মদপুর, বছিলা, ভাটারা ও উত্তরা দিয়াবাড়িসহ রাজধানীর প্রায় সব অস্থায়ী হাটেই একই ধরনের ধীরগতির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিশেষ করে বড় গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে স্থবিরতা আরো বেশি দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি বড় গরুর দাম ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হলেও ক্রেতার আগ্রহ না থাকায় সেগুলোর বিক্রি শুরু হয়নি।
বিকেলের বৃষ্টির কারণে হাটগুলোতে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। অনেক জায়গায় কাদা ও পানি জমে যাওয়ায় ক্রেতাদের হাঁটাচলা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে যেসব ক্রেতা দুপুরে বা বিকেলের শুরুতে হাটে এসেছিলেন, তারাও দ্রুত সময়ের মধ্যে ফিরে যান বা অপেক্ষায় থাকেন।
এতে হাটের ভিড় কমে যায় এবং দরকষাকষির পরিবেশও দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৃষ্টি থামার পরও মানুষের উপস্থিতি আগের মতো হয়নি, যা সামগ্রিক বেচাকেনাকে আরো ধীর করেছে। বৃষ্টি চলমান থাকলে বেপারিদের আরো লোকসানের মুখে পড়তে হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
এদিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে থাকা হাটগুলোতে নিয়মিত তদারকি করছে ভ্রাম্যমান টিম। তারা জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের বাইরে বেচাকেনা করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং অতিরিক্ত হাসিল আদায় করা যাবে না।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার কুরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা চাহিদার তুলনায় বেশি। ফলে সরবরাহে কোনো সংকট নেই। তবে প্রকৃত ক্রেতা চাহিদা তৈরি না হওয়াই এখন বাজারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে রাজধানীর কুরবানির পশুর হাটগুলোতে পর্যাপ্ত পশু থাকলেও দাম চড়া, ক্রেতা কম এবং বিকেলের বৃষ্টির প্রভাবে কেনাবেচা আরো ধীরগতির হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ী ও খামারিরা এখন ঈদের আগের শেষ কয়েক দিনের দিকে তাকিয়ে আছেন, যখন বাজারে স্বাভাবিকভাবে ভিড় ও লেনদেন বাড়ার আশা করা হচ্ছে।